ঢাকা, রবিবার, ২২ অক্টোবর ২০১৭, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯
শিরোনামঃ
ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাত রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানকে গুতেরেসের সমর্থন গত কদিনে বাংলাদেশে ঢুকেছে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ১১ সাক্ষীকে জেরার জন্য খালেদার আবেদন হাই কোর্টে নিষ্পত্তি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের কাজে নিরপেক্ষতা থাকতে হবে: সিইসি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১৪ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শিশু অপুষ্টিতে মারা যেতে পারে নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে সবাই আইন মেনে চলুন টস জিতে ব্যাটিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা আবহাওয়ার উন্নতি: দেশের বিভিন্ন রুটে নৌ চলাচল স্বাভাবিক নির্বাচন নিয়ে সরকার নীল নকশা করছে: রিজভী ২৫টি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার সাথে বৈঠকে বসেছে ইসি ফাইনালে আজ মুখোমুখি হচ্ছে ভারত ও মালয়েশিয়া স্পেনের কেন্দ্রীয় শাসন না মানার ঘোষণা কাতালান প্রেসিডেন্টের উন্নত বাংলাদেশ গড়তে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখুন: জয় ইপিএল-এ জয় পেয়েছে চেলসি ও ম্যানসিটি বেড়িবাঁধ ভেঙে বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ব্যাহত ফেরি চলাচল টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন বন্দরের কার্যক্রমে স্থবিরতা মালয়েশিয়ায় ভূমিধসে তিন বাংলাদেশীসহ ৪ শ্রমিকের মৃত্যু কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে দিলো স্পেন

সুলতানের চিত্রকর্ম: বাংলার কৃষিজীবনের চিরায়ত আলেখ্য

প্রকাশিত: ০৫:০৬ , ১০ অক্টোবর ২০১৭ আপডেট: ০৫:০৬ , ১০ অক্টোবর ২০১৭

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক:  প্রতিটি মানুষ মাত্রই যেন একজন চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠার কোমল বাসনা মনের গহীনে ধারণ করে থাকেন। কেননা একজন চিত্রশিল্পীই পারেন সাদা ফ্রেমে জলরঙের ছাপে জীবনকে বাস্তবরুপে ফুটিয়ে তুলতে, জীবন সম্পর্কে নিজের অনুভূতিগুলোকে আলাদা আলাদা রং দিতে। এমনই একজন বিখ্যাত চিত্রকর হলেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান, যিনি এস. এম. সুলতান নামে দেশে এবং বিদেশে সমধিক পরিচিত।
এস. এম. সুলতান ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত তথা বর্তমান বাংলাদেশের নড়াইল জেলার মাছিমদিয়া গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর বাবা শেখ মোহাম্মদ মেছের আলী পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রী। শৈশবে পরিবারের সবাই তাকে লাল মিয়া বলে ডাকতো। এ ছাড়া তিনি ছিলেন বড়দের কাছে কাকাবাবু আর ছোটদের কাছে দাদুভাই। আর এই সম্বোধনেই তিনি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।
অবধারিতভাবে তাঁকে বিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো সামর্থ্য তাঁর দরিদ্র পিতার ছিলো না। তবুও বহু কষ্টে মেছের আলি তাঁর সন্তানকে নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করান। এস. এম. সুলতান এখানে পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেন। এরপর স্কুল ছেড়ে বাড়ি ফিরে বাবার সাথে রাজমিস্ত্রীর কাজ শুরু করেন। রাজমিস্ত্রীর কাজ করার পাশাপাশি তিনি সেই দালানগুলোর ছবি আঁকতেন।  ১০ বছর বয়সে স্কুলে পড়ার সময় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী স্কুল পরিদর্শনে এসে তাঁর আঁকা ছবি দেখে প্রশংসা করেছিলেন। তাঁর খুব ইচ্ছা ছিল ছবি আঁকা শিখবেন। এজন্য প্রয়োজন হলে কলকাতায় যাবেন। কিন্তু এরকম আর্থিক সঙ্গতি তাঁর পরিবারের কখনোই ছিলনা। পরবর্তীতে তাঁর এলাকার জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। জমিদারের সাহায্য নিয়ে সুলতান ১৯৩৮ সালে কলকাতা যান। এরপরে তিনি ১৯৪১ সালে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। এখানে তিন বছর পড়াশোনা করেন এবং পাশ করে তিনি ফ্রিল্যান্স চিত্রশিল্পী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
এ সময়ই তিনি আমাদের জাতীয় নেতা হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী’র বড়ভাই, প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক এবং কলকাতা আর্ট স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন। সুলতানের জন্য সোহরাওয়ার্দী তাঁর গ্রন্থাগারের দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং তাঁকে সবধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকেন। সুলতানের কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রেও শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর অবদানই ছিল মুখ্য। তিন বছর আর্ট স্কুলে পড়াশোনার পর তিনি বেছে নেন একজন ফ্রি-ল্যান্স শিল্পীর জীবন। আর্ট স্কুলের বাঁধাধরা জীবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার রীতিনীতি তাঁর সহজাত খেয়ালি জীবনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছিলো।
সুলতান ছিলেন স্বাধীনচেতা এবং প্রকৃতিগতভাবে ভবঘুরে, ছন্নছাড়া। তিনি প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন একজন রোমান্টিক কবির আবেগ দিয়ে এবং সেরকম তীব্রতা নিয়েই তিনি অস্বীকার করেছেন যান্ত্রিকতা-পিষ্ট নগর ও নাগরিক জীবনকে। তিনি ভালোবাসতেন ফুল-ফল, লতা-পাতা, ঘাসফুল। তিনি কুকুর, বিড়াল, বানর, উটপাখি, ঘোড়া থেকে শুরু করে পুষতেন কাক এমন কি বনশালিকও। তিনি নিজ হাতে মাতৃস্নেহে এসব প্রাণীর খাবার পরিবেশন করতেন। কোনো একটি প্রাণী অসুস্থ হলে তিনি মর্মাহত হতেন, ওকে যার পর নেই সেবা করে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলার আগপর্যন্ত তিনি থাকতেন বিচলিত। তাঁর নিজের চিড়িয়াখানার সকল সদস্যকে খাবার দেয়ার পরই তিনি নিজে খাদ্য গ্রহণ করতেন।
১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন। তারপর তিনি বেরিয়ে পড়েন উপমহাদেশের পথে পথে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, তখন সারা ভারত জুড়ে ইংরেজ ও আমেরিকান সৈন্যদের বিচরন। এসব সৈন্যদের ছবি এঁকে এঁকে ও তাদের কাছে সেসব বিক্রি করে সেই পয়সায় তখন জীবন ধারণ করতেন তিনি। সে সময়ে মাঝে মাঝে কিছু প্রদর্শনীও করেছেন। আর এরই মধ্যো দিয়ে শিল্পি হিসেবেও কিছুটা পরিচিতি লাভ করেছিলেন তখন। কিন্তু সুলতানের ছিল পার্থিব বিষয়ের প্রতি চরম অনীহা আর কোথাও স্থায়ী হওয়ার প্রতি তীব্র অনাগ্রহ। এ কারণে তখনকার আঁকা ছবির নমুনা, এমনকি ফটোগ্রাফও এখন আর নেই। তবে সে সময় প্রধানত তিনি নিসর্গ দৃশ্য এবং প্রতিকৃতির দৃশ্যাবলীই এঁকেছেন।
একদা কাশ্মীরে তিনি বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলেন। ১৯৪৬ সালে সিমলায় তাঁর আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়। দেশ বিভাগের পর তিনি কিছুদিনের জন্য দেশে ফেরেন। ১৯৫০ সালে চিত্রশিল্পীদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য তিনি আমেরিকা যান এবং নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো, বোস্টন এবং এরপর লন্ডনে তাঁর ছবির প্রদর্শনী করেন। সেখান থেকে ফিরে ১৯৫১ সালে করাচি চলে যান। সেখানে পারসি স্কুলে শিল্প শিক্ষক হিসেবে দুবছর কাজ করেন। এ সময়ে চুঘতাই ও শাকের আলীর মতো শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়।
১৯৫৩ সালে আবার নড়াইল ফিরে তিনি শিশু শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। শিশুদের নিয়ে সুলতানের অনেক স্বপ্ন ছিল। শেষ বয়সে নড়াইলে শিশুস্বর্গ ও চারুপীঠ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এর কিছু বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। নড়াইলে তিনি নন্দন কানন নামের একটি প্রাইমারি ও একটি হাইস্কুল এবং একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তিনি নিজ হাতে শিশুদের ছবি আঁকা শিখাতেন। তাঁর প্রিয় চিত্রা নদীতে তার নিজ বানানো শিশুস্বর্গে ঐ সকল শিশুদের নিয়ে ভেসে বেড়াতেন একজন শিশুর মতো।
বিখ্যাত এই চিত্রকর চেতনায় ছিলেন ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং প্রকৃতিগতভাবে ভবঘুরে এবং ছন্নছাড়া। প্রকৃতিকে তিনি সবসময় রোমান্টিক কবির আবেগ দিয়ে ভালোবেসেছেন একই সাথে যান্ত্রিক নগর জীবনকে ঘৃণা করেছেন। এস. এম. সুলতানের কাছে আধুনিকতা কেমন ছিলো-- এ প্রসঙ্গে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, “তাঁর কাছে অবয়বধর্মিতাই প্রধান। তিনি আধুনিক, বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করেননি, তাঁর আধুনিকতা ছিলো জীবনের শাশ্বত বোধ ও শিকড়ের প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থানকে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ঔপনিবেশিক সংগ্রামের নানা প্রকাশকে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপন করেছেন। এটাই তাঁর কাছে ছিলো 'আধুনিকতা', অর্থাৎ তিনি ইউরো-কেন্দ্রিক, নগর নির্ভর, যান্ত্রিকতা-আবদ্ধ আধুনিকতার পরিবর্তে অন্বেষণ করেছেন অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের মতো মানবের কর্মবিশ্বকে।”
এ জগত বিখ্যাত চিত্রশিল্পী তাঁর জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, সংগ্রাম-বিপ্লব এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। তাঁর ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণীদ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তব রূপ অনেকটা ফুটে উঠেছে। তাঁর ছবিগুলোতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
সুলতানের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, নিজ দেশ ও জাতি নিয়ে এক হিমালয়সম গর্ব, সাধারণ মানুষকে নিয়ে তাঁর দুর্নিবার অহংকার, ভালবাসা, মমত্ববোধ পাশাপাশি সমাজের অন্যায়ের প্রতি প্রচন্ড প্রতিবাদ, ক্ষোভ, আন্দোলন তাঁর তুলির পরশে বিশাল বিশাল ক্যানভাসে জীবন্ত রূপায়িত হয়েছে। বিষয়বস্তুতে গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষ, শ্রমিক, কৃষাণ, এদেশের কাদাজলের সাথে যাদের আত্মিক সম্পর্ক, যাদের রুটি-রুজির উৎপত্তি স্থল সেই মাঠ, প্রান্তর, সবুজ ধানক্ষেত, যেখানে জমি কর্ষণরত চাষী, রাখালেরা বাঁশীর সুরে মগ্ন, জেলে মাছ ধরায় ব্যস্ত, গৃহস্থালীর কাজে মনোযোগী পল্লীবালা, মাছকোটা, ধানবোনায় ব্যস্ত সুখী পরিবারের চিত্র। কুঁড়েঘর, উঠোন, খড়ের পালা, কলাগাছের সারি, অলস দুপুরে গৃহিনীরা গল্পে ব্যস্ত। গোধূলী বেলায় দূরে কোথাও মেঠোপথে ধূলো উড়িয়ে পল্লী-বধূর বাবার বাড়ি যাওয়ার দৃশ্য। সারি সারি তাল, নারকেল গাছ, বনজঙ্গল, নদীতে পালতোলা নৌকা, মাঝির ভাটিয়ালী সুর, জাল দিয়ে মাছ ধরা, গুনটানায় ব্যস্ত মাল্লা, নদীর ঘাটে কলসীতে জল আনতে গ্রাম্য বধূর সলাজ চাহনি।
তিনি শুধু বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন, তাঁকে বিশ্ব জুড়ে কাল্পনিক কৃষি সভ্যতার জনক বলা হয় । তাঁর জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই খেটে খাওয়া কৃষিজীবী মেহনতি মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। তাঁর চিত্রকর্মে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণীর দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সংগ্রামীরূপ ফুটে উঠেছে শিল্পীর একান্ত নিজস্ব মহিমায় ও স্বকীয়তায়। তাঁর ছবিগুলোতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাঁর জীবনকে কৃষি এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তিনি শেষ জীবনে তার পরিপূর্ণতা নিয়ে এইভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন- “আমি সুখী। আমার কোনো অভাব নেই। সকল দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে।”
সুলতানের আঁকা ছবিগুলোতে বাঙালি কৃষকদের দৈহিকভাবে একরকম বলিষ্ঠ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং চিত্রকর বলেছিলেন, “আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ন, কৃষকায়। একেবারে কৃষক যে, সেও খুব রোগা, তার গরু দুটো, বলদ দুটো-- সেটাও রোগা...। আমার ছবিতে তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা আমার মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমনভাবে আমি ভালোবাসি সেভাবেই তাদের তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের দেশের এই কৃষক সম্প্রদায়ই একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো। দেশের অর্থবিত্ত ওরাই যোগান দেয়। আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা রুগ্ন কেন-- যারা আমাদের অন্ন যোগায়, ফসল ফলায়। ওদের বলিষ্ঠ হওয়া উচিৎ।”
তাঁর চিত্রগুলোতে সুডৌল ও সুঠাম গড়নে গ্রামীণ নারীকে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি যেন নারীর মধ্যে উপস্থিত চিরাচরিত রূপলাবণ্যের সাথে শক্তির সম্মিলন ঘটিয়েছেন। একই সাথে তাঁর ছবিগুলোতে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের শ্রেণী-দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কিছু ক্রুর বাস্তবতা উঠে এসেছে। তাঁর এরকম দুটি বিখ্যাত ছবি হচ্ছে হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) এবং চরদখল (১৯৮৮)।
মধ্য সত্তরে সুলতানের কিছু শুভানুধ্যায়ী তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকায় থেকে তিনি কিছু ছবি আঁকেন এবং ১৯৭৬  সালে সেসব ছবি দিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। বস্তুত এ প্রদর্শনীটিই তাঁর ছবির সঙ্গে দর্শকদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাঁর ছবিতে গ্রাম হচ্ছে বিশ্বের কেন্দ্র এবং কৃষকই হচ্ছে প্রকৃত জীবনশিল্পী। গ্রাম ও গ্রামের মানুষের মধ্যেই তিনি খুঁজেছেন তাঁর সৃষ্টির অনুপ্রেরণা। এজন্য কৃষক ও কৃষকের জীবন একটা কিংবদন্তীর শক্তি নিয়ে উপস্থিত তাঁর ছবিতে।
সুলতান আশির দশক থেকে নড়াইলে থেকে যেতে অনেকটা বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর কাছে যেসব মানুষ এবং শিশু আশ্রয় নিয়েছিলো তাদের জন্য তিনি নিজের ঘর ছেড়ে দেন। জীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি একটি চিড়িয়াখানা তৈরি করেন এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে শিশুদের জন্য সুন্দরী কাঠ দিয়ে একটি বড় আকারের নৌকাও তৈরি করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিলো শিশুরা সেই নৌকায় চড়ে সমুদ্র পরিভ্রমণে বের হবে আর শিল্পচর্চার উপকরণ খুঁজে পাবে।
তিনিই একমাত্র শিল্পী যিনি পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালি, জন ব্রাক, পল ক্লী, জন মার্টিন প্রমুখের সাথে যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহন করা সুযোগ পেয়ে ছিলেন। তিনি ১৯৮০’র দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার গ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে নিউইয়র্কে ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কর্তৃক আয়োজিত সেমিনারে সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়াও ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে আন্তর্জাতিক জুরি কমিটির অন্যতম সদস্য মনোনীত হন। তিনি ১৯৮২ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
১৯৯৪ সালে ঢাকার গ্যালারি টোনে তাঁর সর্বশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সে-বছরেরই আগস্ট মাসে নড়াইলে ঘটা করে তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়।
এই প্রচারবিমুূখ মানুষটি শুধু চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন একজন সুরসাধক এবং বংশীবাদকও। এমনকি পায়ে নুপুর বেঁধে শাড়ি পরে নৃত্যও করতেন তিনি। অধিকাংশ সময় তিনি বাউল সুরের গানের সাথে তাল মিলিয়ে নেচে নেচে ছবি আঁকতেন। তিনি পাজামা-পাঞ্জাবির পাশাপাশি শাড়ি পড়ে নারীর বেশে থাকতেও বেশ পছন্দ করতেন। তাঁর নিজ নামানুসারে ‘লাল বাউল সম্প্রদায়’ নামে একটি বাউল দলও রয়েছে নড়াইল ও তার আশেপাশের অঞ্চল জুড়ে।
শেষ বয়সে তিনি শিশুশিক্ষার প্রসারে কাজ শুরু করেছিলেন যা নিয়ে তাঁর অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল। তিনি নড়াইলে শিশুস্বর্গ এবং চারুপীঠ নামে দুটি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় তোলেন। এ ছাড়া সেখানে ‘নন্দনকানন’ নামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি উচ্চ বিদ্যালয় এবং ‘নন্দনকানন স্কুল অব ফাইন আর্টস’ নামে একটি আর্ট স্কুলও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।
আশির দশকের শেষদিকে তাঁর স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে বার্ধক্য জনিত কারণে এস. এম. সুলতান তাঁর প্রিয় চিড়িয়াখানা, শিশুস্বর্গ, আদরের বিদ্যাপীঠ আর সারা জীবনের বিস্ময়কর সকল সৃষ্টিকর্মসহ তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের পরম সঙ্গী  চিত্রা নদীকে বহমান রেখেই চলে যান না ফেরার দেশে।

এই সম্পর্কিত আরো খবর

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is