ঢাকা, রবিবার, ২২ অক্টোবর ২০১৭, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯
শিরোনামঃ
ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাত রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানকে গুতেরেসের সমর্থন গত কদিনে বাংলাদেশে ঢুকেছে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ১১ সাক্ষীকে জেরার জন্য খালেদার আবেদন হাই কোর্টে নিষ্পত্তি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের কাজে নিরপেক্ষতা থাকতে হবে: সিইসি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১৪ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শিশু অপুষ্টিতে মারা যেতে পারে নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে সবাই আইন মেনে চলুন টস জিতে ব্যাটিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা আবহাওয়ার উন্নতি: দেশের বিভিন্ন রুটে নৌ চলাচল স্বাভাবিক নির্বাচন নিয়ে সরকার নীল নকশা করছে: রিজভী ২৫টি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার সাথে বৈঠকে বসেছে ইসি ফাইনালে আজ মুখোমুখি হচ্ছে ভারত ও মালয়েশিয়া স্পেনের কেন্দ্রীয় শাসন না মানার ঘোষণা কাতালান প্রেসিডেন্টের উন্নত বাংলাদেশ গড়তে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখুন: জয় ইপিএল-এ জয় পেয়েছে চেলসি ও ম্যানসিটি বেড়িবাঁধ ভেঙে বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ব্যাহত ফেরি চলাচল টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন বন্দরের কার্যক্রমে স্থবিরতা মালয়েশিয়ায় ভূমিধসে তিন বাংলাদেশীসহ ৪ শ্রমিকের মৃত্যু কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে দিলো স্পেন

রঞ্জন ঘোষাল

অণুগল্প: চমকিয়া বাদরাহা বাবু

প্রকাশিত: ১২:৫৯ , ১১ অক্টোবর ২০১৭ আপডেট: ১২:৫৯ , ১১ অক্টোবর ২০১৭

বুঝি বুঝি করেও কথাটা ধরতে পারা যাচ্ছিল না কিছুতেই। অথচ এ তো পরিষ্কার পচ্ছিমা ভাষা। মহিলা ভিক্ষে চাইতে এসেছে। বলছে, “দ্যা দ্যা মাইজী, চম্কিয়া বাদরাহা রাজা”। কখনো বলছে – “চমকিয়া বাদরাহা বাবু”। শেষের “বাবু বা রাজা” এবং গোড়ার “দ্যা দ্যা মাইজি” মানে অবভিয়াসলি, দে দে মা, এই ল্যাজামুডো বাদ দিলে পড়ে থাকে চমকিয়া ও বাদরাহা। ভিক্ষাপ্রার্থিনীর চেহারা একটু বানজারা ঘরানার। নাকে ফাঁদি নথ। বলীরেখাবহুল মুখ। পরণে মলিন, চুমকি বসানো ঘাঘরা।
আমাদের আসানসোলে এমন নানা কিসিমের আজব মানুষ আমরা দেখতে পেতাম। রাস্তার দারুন ভালো ইংরিজি জানা উলঙ্গ ভিখিরি। পাঁউরুটি বেচতে আসা লোক, যে ছত্তিরিশ রকমের প্যাটি বানাতে জানত, উনকোটি রকমের কেক, টী-বিস্কিট, কিন্তু নিজে খেত ছাতু আর আচার।
আমাদের মা-মাসিমাদের মধ্যে একমাত্র কোকোর মা ভালো হিন্দী জানতেন। আমাদের লাগোয়া বাড়ি। দ্যা দ্যা মাইজীর বুলি শুনে উনি বললেন, মনে হচ্ছে মহিলা বলতে চাইছে - বাদল, মানে মেঘ চম্কাচ্ছে। হে রাজাবাবু, হে মাইজী। বড়ো দুঃসময়ে পড়েছি। কিছু দাও।
ভিক্ষোপজীবিনীর পায়ে ভারী ভারী দস্তার মল। হাতে তামার আর পিতলের বালা। কাঁধে একটি রাজস্থানী ঝোলা। তাতে শতেক তাপ্পি, ভাঙা আয়নার কারুকাজ। “কোত্থেকে এসেছো?” জিজ্ঞেস করলে শুধু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। শুধু বলে - চমকিয়া বাদরাহা রাজা।
আসানসোল খনি অঞ্চল। নানান জাতের, নানান ভাষার মানুষ সেখানে জীবিকার টানে এসেছে। খনি শ্রমিক, দালাল, ওয়াগনব্রেকার, ডাকু, বদমাশ, আর হরেক রকম পাগল। এবং তাদের বাগে আনবার জন্য দু ধরণের পুলিশ ফোর্স। টাউন পুলিশ এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুলিশ।
জহরমল জালান ইন্সটিটিউট একটি গম্গমে হাইস্কুল। রোজানা সেখানে ছেলেদের বিনামূল্যে টিফিন খাওয়ানোর বন্দোবস্ত। টিফিন বেলায় বাইরেও একটা লাইন পড়ে। ভিখিরিদের। তাদের ভাগ্যেও ছিটেফোঁটা জোটে। আমরা শর্ট ব্রেকে পাই পাঁচ-পাঁচটি ব্রিটানিয়া থিন এরারুট বিস্কুট। বড়ো ব্রেকে সুবুজ জ্যাম মাখানো না-টোস্ট করা পাঁউর“টির স্যান্ডুইচ এবং কোনো একটা সীজনাল ফল। এ হল মারোয়াড়ি বদান্যতার দৌলতে। স্কুলের মাইনে ছিল যৎসামান্য।
একদিন দেখলাম, দস্তার মল ঝমঝমিয়ে “দ্যা দ্যা মাইজী” এসে স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। দারোয়ান আটকালো না। মহিলা সটান দোতলায় গিয়ে স্কুলের হেডমাস্টারের ঘরে। আমাদের ছিল দোতলার ক্লাসরুমে গ্রামারের ক্লাস। থ্রী বি। শুনলাম, হেডস্যার বিমল মধুকল মহিলাকে ধমকাচ্ছেন, মাঁ, তোহে কহিছন্ নু, ইস্কুলমা আয়া মৎ করিয়ো। ফির আয়ী কাহে রে?
মহিলার গলায় উদ্বেগের চিহ্ন। বলছেন - চম্কিয়া বাদরাহা বেটা।
হেডমাস্টার মশাই ঐ বৃদ্ধার হাত ধরে নিজের কামরার বাইরে নিয়ে এসে বললেন, মাঈ, তু ঘবড়ানা নাহি রে। ব্দারাহা মাদরাহা কুছু নাহি। গগনমা দিখ। বিজুরী চম্কিয়া নাহি কনো।
মহিলা হেডস্যার বিমল মধুকল সাহিবকে আঁকড়ে ধরে আছেন। আমরা ক্লাস থ্রি। আমাদের কেউ তেমন বকেটকে না। আমরা এগিয়ে গিয়ে বললাম, প্রধানজী। হমলোগ ইন ভিখারীনকো জানতে হ্যায়। আপ কুছ ডাল দিজীয়ে ইন্কে ঝোলি মেঁ, উও চলী জায়েগী।
হেডমাস্টার সস্নেহে হেসে বললেন, না রে। ইনি হলেন শ্রীমতী লীলাবতী জালান। মারওয়াড়ি হলেও দারভাঙা জেলায় এঁদের ছিল বাস। মৈথিলীও বলেন, মারোয়াড়িও বলেন। এঁর স্বামীর নামে এই স্কুল। এই অঞ্চলে তিনটি বড়ো বড়ো কয়লা খনি ছিল এঁদের। অনেক টাকা দিয়েছেন ইনি ট্রাস্টিকে। বলেছিলেন বাঙালি, বিহারী, মারোয়াড়ি সব ছেলেমেয়েরা পড়বে, সবাই সব ভাষা শিখবে, ভাইচারা তৈরি হবে এই ভেবে স্কুল। সেই টাকা ফুরোয়নি। তাই দিয়ে স্কুলের এমন রম্রমা। স্কুলের খরচ খরচা চলে। আমি ওঁকে মা বলেই ডাকি। মা এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান, ভিক্ষে করেন, মেঘ ডাকলে ভয় পান। পাগল কিনা? সে অনেক কাহিনি। যা তোরা ক্লাসে গিয়ে বোস। ক্ষীরোদবাবু আসেননি বুঝি আজ?
আমরা খুব অবাক হলাম। আমরা বললাম, আজকে আমাদের ফাউন্ডার এসেছেন স্কুলে। তা হলে আজ আমাদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হোক। হেডস্যার বললেন, না রে। অন্য একদিন হবে। আমরা সবাই মিলে দিশেরগড়ে পিকনিকে যাবো। দেখব, মা-কেও যদি ধরে বেঁধে নিয়ে আসা যায়।
চীন ভারতের যুদ্ধের বছর সেটা। আমাদের শহরের বিখ্যাত পাগল ব্রজকিশোর ঝা কম্পালসরি মিলিটারি ট্রেইনিং-এর উপযোগিতা নিয়ে নিউ সিনেমার সামনে একটি ওজস্বিনী বক্তৃতা দেন। বহু লোক ভিড় করে শুনেছে তাঁর বক্তব্য। কিন্তু উনি সম্পূর্ণ দিগম্বর ছিলেন বলে, সেই বক্তৃতা শেষ হওয়ার আগেই টাউন পুলিশ ওঁকে বেঁধে নিয়ে যায়। নেফায় যুদ্ধরত আমাদের ভারতীয় ফৌজ একটি আসানসোল রেজিমেন্টের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি থেকে বঞ্চিত হল।
এই আসানসোলেই এক অদ্ভুত দুর্ঘটনার পরে সারা শহর একদিন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়, যাদের মাথা খারাপ, তারা সবাই নিশ্চুপ হয়ে যায়। তারা কেউ আর কোনোদিন কোনো বড় রকমের গন্ডগোল করে নি।
মহীশীলা কলোনী যুব সংঘ নানা রকম সমাজ সেবা প্রকল্প নিয়েছে আগ বাড়িয়ে। দুর্গাপুজোর চাঁদা তোলা প্রতিবছর। বড় বড়ো ব্যবসায়ী আছে আসানসোলে। তাদের কাছ থেকে জোর জুলুম করে মোটা রকম চাঁদা তোলে। পুজোটা সারে নমো নমো করে। বাকি টাকাটা কখনো মেদিনীপুরের বন্যাদুর্গতদের ত্রাণে লাগিয়ে দেয়, কখনো অনাথ আশ্রম বানায়। সেবার একটা মানসিক হাসপাতাল  তৈরি করে ফেলল মহীশীলা কলোনী যুব সংঘ। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, ঠিক-ঠিকানাবিহীন পাগলদের জন্য একটা স্বস্থির আশ্রয়। কয়েকজন মনোচিকিৎসকও জুটে গেল কপালগুণে, যারা বিনা বা অল্প পারিশ্রমিকে কাজ করতে রাজি।

খনিতে অনেক সময়ে মিথেন গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হয়। সেদিন সকাল আটটায়, ধনবাদ থেকে হাওড়াগামী কোলফিল্ড এক্সপ্রেস যখন সীতারামপুর ছাড়িয়ে সকাল ছটা বাহান্নয় তীব্র গতিতে আসানসোলে ঢুকবে, তখনো কুয়াশা কাটেনি। মহীশীলা কলোনী যুব সংঘ তখন মানসিক হাসপাতালের বাগানে পাগলদের সঙ্গে হাত লাগিয়ে কাজ করতে গেছে। রেললাইন থেকে দুশো গজের মধ্যেই সেই বাগান। হঠাৎ একটা মিথেন ব­াস্টের আওয়াজে সচকিত হয়ে তারা তাকিয়ে দেখে বিস্ফোরণটা ঘটেছে রেললাইনের ঠিক ঊপরে।

লোহার রেল খানিকটা উপড়ে গেছে। নাটবল্টু সমেত দু দুখানা রেলওয়ে স্লীপার উৎক্ষিপ্ত হয়েছে শূন্যে। আপ কোলফীল্ড তখন প্রচন্ড স্পীডে এগিয়ে আসছে। যুব সংঘের সদস্যরা উপায়ান্তর না দেখে লাইনের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে পরণের ধুতি চাদর খুলে ফেলে বিপদজ্ঞাপক সিগ্ন্যাল দিতে থাকে। ঐ স্পীডে ধেয়ে আসা ট্রেনের তখন কিছু করার ছিল না। প্রচন্ড জোরে ব্রেক মারা সত্ত্বেও যুব সংঘের বারো জন সদস্য চাকার তলায় পিষে যায়। ঊপড়ে যাওয়া রেললাইনের মাত্র দশ ফুট দূরে ট্রেনটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায়। ট্রেনের এগারো শো যাত্রীর প্রাণ বাঁচে।
পাগলখানায় ঘন্টা বাজতে থাকে। বাজতে থাকে। বাজতেই থাকে। জনা চলি­শ পাগল সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সামনে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
লাইন থেকে মৃতদেহ সরে। ক্ষতিগ্রস্ত লাইন থেকে গাড়িগুলো অন্য লাইনে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে সন্ধ্যে নামে।

পাগলরা সারাদিন কথা বলে নি। খায় নি। শুধু রেললাইন ছুঁয়ে বসে থেকেছে। ওরা মনে মনে পাগল হিসেবে লজ্জাবোধে আক্রান্ত ছিল।


মহীশীলা কলোনী যুব সংঘের ঐ ছেলেদের মায়েরাও কেউ চোখের জল ফেলে নি। আমি জানি। কারণ, আমাদের অমুদা ছিল ঐ দলে। আমার সেজো পিসির ছেলে। পিসী বলেছিল, এই ছেলেরা খুব ‘যুদ্ধে যাবো যুদ্ধে যাবো’ করে নেচেছিল। ভাগ্যিস্ যেতে দিই নি। নইলে এই এগারোশো নিরাপরাধ রেলযাত্রীদের প্রাণ বাঁচতো?

 

এই সম্পর্কিত আরো খবর

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is