ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

শীতকালে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ানোর প্রাকৃতিক উপায়

প্রকাশিত: ০৬:২৫ , ১৩ নভেম্বর ২০১৭ আপডেট: ০৬:২৫ , ১৩ নভেম্বর ২০১৭

ডেস্ক প্রতিবেদন:  শীতকালে আমাদের রোগ-প্রতিরোধ সিস্টেম দুর্বল থাকে। আর এই সময়টাতে আমাদের দেহ রোগ সংক্রমণের জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। কেননা তাপমাত্রা সেসময় ভাইরাস জন্মের অনুকূলে থাকে। এরা ঠাণ্ডা এবং শুকনো অঞ্চল পছন্দ করে।
আর তাছাড়া শীতের সময় আমাদের দেহ গরম রাখতে অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় হয়ে থাকে। যা আমাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে তোলে। আর সে কারণেই শীতকালে আমাদের রোগ-প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী এবং সচল রাখাটা জরুরি যাতে কোনো রোগের সংক্রমণ না হয়।

মানবদেহের রোগ-প্রতিরোধ সিস্টেম গড়ে উঠেছে হাড়ের মজ্জা, প্লীহা, থাইমাস এবং লসিকা গ্রন্থির সমন্বয়ে। হাড়ের মজ্জা থেকে তৈরি হয় সাদা রক্ত কোষ, যা আমাদের দেহে সব ধরনের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে রয়েছে অনেক প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এখানে এমন কিছু খাদ্যের তালিকা দেওয়া হলো যেগুলো রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে।

১. তাজা ফলের জুস
তাজা ফলের জুসে থাকে ভিটামিন এ এবং সি। এই দুটি ভিটামিন ভাইরাল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেশ কার্যকর। ভিটামিন সি রক্তে সাদা কোষ এর সংখ্যা বাড়ায়।

২. প্রচুর পানি পান
দেহকে সচল রাখতে হলে একে আদ্র রাখতে হবে। আর এজন্য প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। এতে প্রতিটি কোষে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রক্তও অতিরিক্ত অক্সিজেন বহন করতে পারবে। এতে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হয়। এছাড়া পানি দেহ থেকে বিষ বের করে দিতেও সহায়ক। যার ফলে রোগ-প্রতিরোধ প্রক্রিয়াও আরও শক্তিশালী হয়।

৩. শরীরচর্চা
শরীরচর্চা আমাদের দেহের জন্য বেশ উপকারী। এটি আমাদের হার্টের মাংসপেশিগুলোকে শক্তিশালী করে এবং আরও বেশি রক্ত পাম্প করতে সক্ষম করে তোলে। এছাড়া এর ফলে আমাদের ফুসফুসের অক্সিজেন ধারণ ক্ষমতাও আরও বাড়ে এবং আমাদের রোগ প্রতিরোধ কোষগুলোকে আরও শক্তিশালী করে যাতে সেগুলো রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। কিন্তু এই প্রভাব ব্যায়াম করার পর মাত্র কয়েক ঘন্টা থাকে। সুতরাং ব্যায়ামের এই প্রভাবকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চাইলে প্রতিদিনই ব্যায়াম করতে হবে।

৪. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
আমাদের ত্বকের উপরিভাগে যেসব অণুজীব বাস করে সেসবের আমাদের দেহের ভেতর প্রবেশ করতে বেশি সময় লাগে না। সুতরাং নিয়মিত গোসল করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। আর প্রতিদিন একাধিকবার হাত ধুতে হবে রোগ-জীবাণুর ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে।

৫. পর্যাপ্ত ঘুম
দেহঘড়ি আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার সেই জিনটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে যেটি রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করতে পারে। ভালো ঘুম হলে দেহে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে আসে। ফলে রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াও শক্তিশালী হয়।

৬. আদা চা
আদা চা দেহে টি-সেল এর উৎপাদন বাড়ায়। যা রোগ-প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এতে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ফ্রি র‌্যাডিক্যালসরা দেহের যে ক্ষয় সাধন করে তা সারিয়ে তোলে। আদা চা এমন একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক দাওয়াই যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার কার্যক্রমসমুহের ভারসাম্য রক্ষা করে।

৭. স্ট্রেস এড়িয়ে চলা
আপনি যখন মানসিক চাপে আক্রান্ত হন তখন দেহের কার্যক্রমগুলো যথাযথভাবে সংঘটিত হয় না। বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়া ঠিক মতো কাজ করে না। দীর্ঘমেয়াদের স্ট্রেস বা মানসিক চাপ থেকে মারাত্মক সব রোগ হতে পারে। যা মূলত রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ার ফল।

৮. প্রোবায়োটিক খাবার
দই বা অন্য যে কোনো প্রোবায়োটিক খাবারে আছে প্রচুর পরিমাণে অন্ত্রের জন্য উপকারি ব্যাকটেরিয়া। প্রোবায়োটিকস-এ আছে ফ্লু ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে তোলার সক্ষমতা। এছাড়া প্রতিকুল পরিবেশ তৈরি করে বেশ কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিও ঠেকায় এসব খাদ্য।

৯. সাইট্রাস জাতীয় ফল
সাইট্রাস জাতীয় ফল ভিটামিন সি সমৃদ্ধ। যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সেরা খাদ্য। এতে আছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা কোষ মেরামত এবং দেহে ফ্রি র‌্যাডিক্যালদের ক্ষয় সারিয়ে তুলতে পারে।

১০. রসুন
রসুনে আছে প্রচুর সালফার, যা ব্যাকটেরিয়া নাশক। এছাড়া রক্তে সাদা কোষের তৎপরতাও শক্তিশালী করে রসুন। যা রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে ।

১১. গ্রিন টি
গ্রিন টি-তে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট দেহে টি-কোষের সংখ্যা বাড়িয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে। এছাড়া গ্রিন টি-তে আছে প্রচুর পরিমাণে এজিসিজি। যা একটি পলিফেনল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যার আছে অনেক রোগ উপশমকারী ক্ষমতা। গ্রিন টি-তে প্রদাহরোধী উপাদানও আছে প্রচুর।

১২. পেঁয়াজ
পেঁয়াজে আছে ভিটামিন সি এবং অন্যান্য ফাইটোক্যামিকেল। যা রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে। এছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের বৃদ্ধিতেও সহায়ক এই উপাদানগুলো।

১৩. গাজর
গাজরে আছে ভিটামিন এ যা রক্তের সাদা কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। এছাড়া এতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি যা দেহের অ্যান্টিবডির পরিমাণ বাড়ায়। যা আবার সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে কার্যকরভাবে।

১৪. স্যামন মাছ
স্যামন বা রুইজাতীয় মাছে আছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড এবং ডিএইচএ উপাদান। যা রক্তের সাদা কোষগুলোকে সক্রিয় করে তোলে। ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড হার্ট এবং অন্যান্য আভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকেও ফ্রি র‌্যাডিক্যাল থেকে সুরক্ষা দেয়।

১৫. বাদাম
নিয়মিতভাবে চীনাবাদাম বা কাজুবাদাম খেলে রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়। বাদামে থাকা ভিটামিন ই একটি বিস্ময়কর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং বুড়িয়ে যাওয়ার গতি কমিয়ে আনে। বাদামে আছে সেলেনিয়াম যা রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়াকে শক্তিশালী করে।

১৬. তাজা সবুজ শাক-সবজি
প্রতিদিনই নতুন নতুন গবেষণায় সবুজ শাক-সবজি খাওয়ার উপকারিতা প্রমাণিত হচ্ছে। রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার জন্য এর চেয়ে ভালো কার্যকর আর কোনো খাবার নেই। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং আঁশ যা দেহকে নানা ধরনের রোগ থেকে রক্ষা করে। এতে এমন কিছু রাসায়নিক আছে যেগুলো রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে যথাযথভাবে সচল রাখতে জরুরি।

১৭. ক্যানজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
ক্যানজাত খাবার আমাদের দেহের প্রচুর ক্ষতি করে। এসব খাবারে থাকে অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ এবং কৃত্রিম ফ্লেভার যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে। এসব খাবার দেহে কার্সিনোজেন এর পরিমাণও বাড়ায় যা রক্তের সাদা কোষগুলোকে ধ্বংস করে। ফলে রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।

১৮. অ্যালকোহল পান ত্যাগ করুন
অ্যালকোহল ক্ষতিকর জিনিস শনাক্তে দেহের সক্ষমতা নষ্ট করে। এছাড়া এটি দেহের প্রদাহিক সক্ষমতা নষ্ট করে যা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াদের দেহে প্রবেশে বাধা দেয়। এটি দেহে টি কোষের সংখ্যা কমায় এবং দেহকে প্যাথোজেনদের জন্য সহজগম্য করে তোলে। ফলে রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।

১৯. ধুমপান ত্যাগ করুন
ধুমপান দেহে অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা নষ্ট করে। এটি রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার সক্ষমতা নষ্ট করে। ধুমপান দেহে অক্সিজেনের মাত্রায় হস্তক্ষেপে করে এবং নানা জটিলতা সৃষ্টি করে। নিকোটিন ফুসফুস এবং হার্টের কোষগুলোকে ধ্বংস করে। এছাড়া আমাদের রোগ-প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে এমনভাবে ধ্বংস করে যে তারা আর আগের মতো হয় না। টিউমার এবং নানা ধরনের ক্যান্সার ছড়াতেও সহায়ক ভুমিকা পালন করে ধুমপান।

২০. অতিভোজন না করা
অতিভোজনের বেশ ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে মস্তিষ্ক এবং রোগ প্রতিরোধ সিস্টেমে। এতে ওজন বাড়ে এবং হজম প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। আমাদের হজম প্রক্রিয়া এবং রোগ প্রতিরোধ সিস্টেম সরাসরিভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। হজম প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়লে রোগ প্রতিরোধ সিস্টেমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আপনি যদি সব বাজে ধরনের খাবার দিয়ে আপনার দেহকে ভরে ফেলেন তাহলে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও হয়ে পড়বে দুর্বল।

এই সম্পর্কিত আরো খবর

উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে ৪১টি মেডিকেল টিম

ডেস্ক প্রতিবেদন: মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য উখিয়া ও টেকনাফে ৪১টি মেডিকেল টিম কাজ...

চিকিৎসক-টেকনিশিয়ানের অভাবে প্রায় অচল গোপালগঞ্জ সরকারি হাসপাতাল

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে গোপালগঞ্জে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল।...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is