ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯
শিরোনামঃ
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ  প্রথম প্রহরে রায়েরবাজার বধ্যভূমি মোমবাতি প্রজ্জলন দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু খাতে ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা সরকারের সৌদি আরবে জিয়া পরিবারের বিপুল অর্থ, তদন্ত করবে দুদক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দাবিতে সোচ্চার হোন থার্টিফার্স্ট নাইটে উন্মুক্ত স্থানে কোনো অনুষ্ঠান নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিক্ষা অধিদপ্তর-বোর্ড ও বিজি প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয়: দুদক বিএনপি নির্বাচনে না আসলে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হবে না পল্লী বিদ্যুতে অতিরিক্ত ইলেকট্রিশিয়ান নিয়োগ দেওয়ায় মানববন্ধন রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে হাইকোর্টে লক্ষ্মীপুরের ইউএনওর ক্ষমা প্রার্থনা খাগড়াছড়িতে ৬ সশস্ত্র যুবক আটক চট্টগ্রামের সেবা সমূহ ডিজিটালাইজড হওয়ার তাগিদ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সারা দেশে বিএনপির বিক্ষোভ আকায়েদের বিরুদ্ধে মার্কিন পুলিশের তিন অভিযোগ আশুগঞ্জে আমন চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু ভূমিমন্ত্রীর ছেলে তমালকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ গাইবান্ধায় যুবলীগ নেতার ও বরগুনায় জেলের মরদেহ উদ্ধার ঢামেক হাসপাতাল দিচ্ছে ডিজিটাল ডেথ সার্টিফিকেট

লাইবেরিয়া: কাছে থেকে দেখা

প্রকাশিত: ১২:০৫ , ১৭ নভেম্বর ২০১৭ আপডেট: ১২:০৫ , ১৭ নভেম্বর ২০১৭

।। ডা. হারুন অর রশীদ ।।

[পূর্বপ্রকাশিতের পর]

পালিত সন্তান

লাইবেরিয়ার সমাজে পালিত সন্তান, অর্থাৎ নিজের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অন্যান্য এতিম বা অভিভাবকহীন শিশুদের দায়িত্ব নিয়ে ভরণপোষণ করার সংস্কৃতি রয়েছে। প্রায় সম্পন্ন পরিবারেই এটা আছে। অনেক পরিবারে একই সঙ্গে ৮/১০ জনও থাকে। ফলে কোনো কোনো পরিবারের ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদে ৭০/৮০ জন হয়ে যায়। এরা প্রায় সময়েই বড় হতে থাকা পরিবারের পারিবারিক নামও ব্যবহার করে পরবর্তীতে। এতিম বা অভিভাবকহীন শিশুদের আশ্রয়দান, বড় করাÑ এ ধরনের উদার মনোবৃত্তি ফস্টার চাইল্ড রাখার ক্ষেত্রে সবসময় কাজ করে তা নয়। অনেক সময় পারিবারিক, সাংসারিক, ক্ষেত-খামারে কাজ করিয়ে নেয়াও এর পেছনের কারণ হিসাবে কাজ করে। তবে যাই হোক, পালিত সন্তান রাখার এই সংস্কৃতি অনেক অসহায় শিশুকে টিকে থাকতে সাহায্য করছে। আমাদের অফিসে কাজ করে এমন একজন যিনি বড় হয়েছেন একটি পরিবারে ফস্টার চাইল্ড হিসাবে। একদিন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে গেলাম একজন সরকারী পদস্থ মহিলা কর্মকর্তার সাথে। মহিলাদের পরিবারে ভাই-বোনের মত বড় হয়েছেন তাঁরা। দেখলাম, তাঁদের মধ্যে খুব মিষ্টি সম্পর্ক বজায় আছে এখনো। বিদায়ের সময় বড় বোনের কাছে ছোট ভাইয়ের আবদার খাটিয়ে তাঁর পার্স থেকে ১৫ ডলার তুলে নিলেন ভদ্রলোক নিজ হাতে। বোনটি বললেন, “আসিস না তো! আসিস মাঝে মাঝে।” 

তিন সুন্দর অনুষঙ্গ

নাচ, গান, ফুটবল লাইবেরিয়ার নাগরিক জীবনের তিন সুন্দর অনুষঙ্গ। নাচতে জানে না, নাচতে পছন্দ করে না এমন কেউ লাইবেরিয়ায় নাই। গান-বাজনা-মিউজিক কানে এসেছে তো শরীর দুলতে শুরু করেছে। চো-েমুখের অভিব্যক্তি স্পষ্টই বলবে, গভীর আনন্দের ছোঁয়া যেন প্রতিটি কোষে কোষে অনুভব করছে শ্রোতারা। স্থান-কাল আয়োজনের অপেক্ষা নেই কারো। গান বাজছে তো নাচ হচ্ছে। পথে-ঘাটে, আচারে-অনুষ্ঠানে, সমুদ্রপারে, হোটেল- রেষ্টুরেন্টে সর্বত্রই নাচ। চলতে-ফিরতে অনেকবার রাস্তার পাশে ছোট্ট দোকানের সামনে মৃদু আলোয় ২০/২২ বছরের যুবতীর নান্দনিক নাচ দেখেছি। নাচকে লাইবেরিয়ানদের সুখী সময়ের প্রতীক বলে মনে হয়েছে। তারা মনের আনন্দেই নাচে, কারো অনুরোধ-উপরোধে নয়। ওয়েস্টার্ণ নাচের প্রতিই তাদের আগ্রহ বেশি। তবে আফ্রিকার নিজস্ব নাচও (ওরা বলে ঃৎরনধষ নাচ) হারিয়ে যায়নি। নৃত্যকলার বিচারে ঃৎরনধষ নাচই বেশি নাম্বার পাবে। সশব্দে বা সাউন্ড বক্স ব্যবহার করে গান বাজানো আর হেড ফোন দিয়ে গান শোনার প্রচলন খুব। শহরে, গ্রামে যেখানেই যাবেন, দেখবেন গান বাজছে ডেক সেটে, এমপ্লি¬ফায়ারে। কানে তালা লাগানো শব্দে গান বাজানোর প্রবণতাও আছে। লক্ষ্য করা গেছে, গানের সৌখীন শিল্পীর সংখ্যাও কম না। আচার-অনুষ্ঠানে আহ্বান জানালে দু-চারজন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সাড়া দেবে। ওরা গায়ও ভালো। গান পরিবেশনের সময় গায়কের সঙ্গে শ্রোতারাও যুক্ত হয়ে যাবে অবলীলায়। গান ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছলেই মুগ্ধ শ্রোতা দৌঁড়ে এসে গায়কের পায়ের কাছে টাকা উপহার দেবে। হয়তো স্টেজে এসে গায়ককে ঘিরে গান আর বাজনার তালে তালে নাচতে আর গাইতে শুরু করবে। আমেরিকান-ইউরোপিয়ান গানের প্রাধান্য আছে, তবে আফ্রিকা অঞ্চলের নাইজেরিয়ার আর ঘানার গান বেশি চলে। লাইবেরিয়ার নিজস্ব হিট গানও থাকে। ২০১১ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী (বর্তমান প্রেসিডেন্ট ম্যাডাম এলেন জনসন সালেফ)-কে নিয়ে গান বাঁধে। অদ্ভুত ছন্দোময় এই গান যেকোনো ওয়েস্টার্ন ক্লাসিককেও হার মানাবে। 

ফুটবল

ফুটবল লাইবেরিয়ানদের প্রিয় খেলা। দেশ জুড়ে তারাও খেলে এবং টিভিতে ইউরোপিয়ান ফুটবল বেশ আয়োজন করে দেখে। কবে কোন্ দলের খেলা যুবক-যুবতীদের জানাই থাকে। মনরোভিয়াতে আনুমানিক এক হাজারের বেশি ছোট-বড় হলঘর আছে। এগুলো অনেকটা সিনেমা হলের মতো, যেখানে টিভি সেটে ফুটবল অনুরাগীরা খেলা দেখে। জেনারেটর চালিয়ে বড় পর্দায় টিভি চালানো হয়। বদ্ধ, গুমোট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘেমে নেয়ে গাদাগাদি করে এরা খেলা দেখে। গোল হলে একযোগে চিৎকার করে ওঠে, যেন সারা শহর ফেটে পড়লো। খেলাশেষে চিৎকার, চেঁচামেচি, তুমুল তর্কে মেতে ওঠে। কখনও কখনও দলের পক্ষে-বিপক্ষে অংশ নিয়ে মারামারি পর্যন্ত শুরু করে। যুবক-যুবতীরা মিলে-মিশে বসেই খেলা দেখে এবং তর্কযুদ্ধে অংশ নেয়। প্রিয় ক্লাব জিতলে নেচে গেয়ে সেলিব্রেট করে। বার্সেলোনা, চেলসি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এদের প্রিয় ক্লাব। ফুটবল শুধু ছেলেরা খেলে না, মেয়েরাও খেলে। কখনও কখনও ছেলে-মেয়েরা মিলে-মিশেও টিম তৈরি করে এবং সমান উদ্যমে খেলে। এমনকি যারা যুদ্ধে আহত বা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এক পা হারিয়েছে, তারাও টিম তৈরি করে ক্রাচে ভর দিয়ে খেলে। এরূপ পা হারানো যুবকেরা একটা ক্লাব তৈরি করেছে, বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা এদেরকে অর্থ সাহায্য দেয়। এদের ফুটবল প্রীতির উদাহরণ দেখা যায় প্রায় সব ব্যক্তিগত ও পাবলিক যানবাহনে ইউরোপিয়ান ফুটবল দলের পতাকা সাঁটা দেখে। গাড়ির সামনের কাঁচে প্ল¬াগ সেটে প্রিয় ক্লাবের ছোট্ট আকারের পতাকা লাগিয়ে দেয়। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, এদের গাড়িতে সামনের কাঁচের ভেতরের অংশে প্রায় ক্ষেত্রেই দুটি পতাকা সাঁটা থাকবে। একটি জাতীয় পতাকার ক্ষুদ্র সংস্করণ ও অন্যটি প্রিয় ফুটবল দলের। ফুটবল খেলোয়াড়দের রঙ-বেরঙের জার্সি ও বুট যত্রতত্র পাওয়া যায়। লাইবেরিয়া থেকে প্রায় সময়ই ইউরোপিয়ান ক্লাবে ২/১ জন খেলোয়াড় থাকে। এদের মধ্যে জর্জ উইয্যা এক সময় গোল্ডেন বল প্রাইজ পাওয়া বিখ্যাত খেলোয়াড় ছিলেন। বর্তমানে তিনি লাইবেরিয়ায় প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা। গত ২০১১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল প্রথম রাউন্ডে বেশ ভালো করেছিলো। মনরোভিয়াতে ক্ষমতাসীন দলের চেয়েও ১০% বেশি ভোট পেয়েছিলো। দ্বিতীয় রাউন্ডে তাঁর দল রণে ভঙ্গ দেয়।

ধুমপান, চা পান

কতগুলো বেশ ব্যতিক্রমী বিষয় লাইবেরিয়ায় চোখে পড়েছে। যেমন ধুমপান ও চা পান। শতকরা একভাগ মানুষও ধুমপান বা চা পান করে না। যারা করে, তাদের বেশির ভাগই মুসলিম। ভিক্ষাবৃত্তিও খুবই সীমিত। মাঝে-মধ্যে দেখা যায়, ভাঙা রাস্তা ঠিক করে বখশিশ হিসাবে আবদার করছে গাড়িওয়ালাদের কাছে। কিন্তু সেটা গাড়ির গতিরোধ করে নয়, শুধু ইশারায় অঙ্গভঙ্গী করে ওরা বিষয়টা প্রকাশ করে থাকে। কেউ দিলে দেয়, না দিলে নেই। 

শনিবারের পরিচ্ছন্নতা

শনিবার হলো লাইবেরিয়ায় সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা দিবস (cleaning day)। সপ্তাহে পাঁচদিন সরকারি কর্মদিবস। শনি রবি বন্ধ। শনিবার সবাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ব্যস্ত থাকে। কাপড় কাচা, বাড়িঘর, আঙিনা পরিষ্কার করা চলবে বেশ আয়োজন করে। শিশুরা ৭/৮ বছর বয়স থেকেই নিজেদের কাপড়-চোপড় ধোবে। পানি টানা, কয়লা কিনে আনা, রান্নায় সাহায্য করা ইত্যাদি শিশুদের পরিচিত ভূমিকা। সন্ধ্যার প্রাক্কালে গোসল করা এবং সন্ধ্যার পরপরই রাতের খাবার দাবার খেয়ে নেয়া এদের অভ্যাস। ছেলে-মেয়ে দল বেঁধে কলের ধারে গোসল করে একেবারে উদোম হয়ে। ১২/১৩ বছর বয়সের মেয়েরাও উদোম হয়ে গোসল করে নির্দ্বিধায়।

অজুহাত ও আলসেমি

মিথ্যা বলা, মিথ্যা অজুহাত তৈরি করা, কাজে ফাঁকি দেয়া, অজুহাত দেখানো বা আলসেমি করা লাইবেরিয়ানদের চরিত্রের বিরক্তিকর দিক। এগুলো শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়, উচ্চশিক্ষিত, উঁচু পদমর্যাদায় আছেন এমন লাইবেরিয়ানরাওও এর বাইরে নন। চুরি, ডাকাতি, খুন, জখম, মারামারি, কাটাকাটি হরহামেশা এরা করে না। তবে সংগঠিত হয়ে করতে পারলে অসম্ভব হিংস্রতার পরিচয় দিতে পারে। যুদ্ধবাজ নেতারা এদের যুদ্ধপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ চৌদ্দ বছর গৃহযুদ্ধ টিকিয়ে রেখেছিলেন। এসময়কার লোমহর্ষক কাহিনী সাধারণভাবে এদের দেখলে অবিশ্বাস্য মনে হবে। ডাকাতি মাঝে-মধ্যে হয়। ডাকাত বা চোর সাধারণ মানুষের হাতে পড়লে সোজা মেরে ফেলবে। মেরে সরকারি বড়রাস্তায় ফেলে রাখবে। রাস্তায় ফেলে রাখার কারণ নাকি দায় থেকে বাঁচার কৌশল। [চলবে]

লেখক: কনসাল্টেন্ট, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
 

এই বিভাগের আরো খবর

লাইবেরিয়া: কাছে থেকে দেখা

।। ডা. হারুন অর রশীদ।। (পূর্ব প্রকাশিতের পর) জুতা প্রীতি লাইবেরিয়ানদের জামা-কাপড় বিশেষ করে জুতা প্রীতি লক্ষণীয় বিষয়। মহিলা বা পুরুষ...

গিরিশচন্দ্র শুধু অনুবাদই নয়, সমাজ পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখেন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভাই গিরিশচন্দ্র সেন শুধু পবিত্র  কোরআন এবং হাদিসের অনুবাদই করেননি, তিনি সমাজ পরিবর্তনেও  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন...

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিল্পীদের নৃত্যকলায় মুগ্ধ সিঙ্গাপুর

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হলো নৃগোষ্ঠীর...

ঢাকা লিট ফেস্ট

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের তাগিদ বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা লেখকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক : রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের তাগিদ দিলেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বুদ্ধিজীবীরাও। সকালে, ঢাকা লিট ফেস্টের...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is