ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫

2018-07-17

, ৪ জিলকদ্দ ১৪৩৯

লাইবেরিয়া: কাছে থেকে দেখা

প্রকাশিত: ০৫:৩২ , ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭ আপডেট: ০৫:৩৯ , ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭


।। ডা. হারুন অর রশীদ।।
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

জুতা প্রীতি
লাইবেরিয়ানদের জামা-কাপড় বিশেষ করে জুতা প্রীতি লক্ষণীয় বিষয়। মহিলা বা পুরুষ একজনের ১৫ থেকে ২০ জোড়া জুতা থাকাটা স্বাভাবিক মনে করে। এর নিচে হলে প্রয়োজনের চেয়ে কম আছে বলে মনে করে। প্রতিদিন নতুন জুতো ও জামা পরে বের হওয়া যুবকযুবতীদের হবি বা সখ বলা যায়। জামা বলতে সাধারণ টি-শার্ট , আর জুতো বলতে কেডসই ওদের বেশি পছন্দ। সেকেন্ড
হ্যান্ড জুতাই বেশি কেনে ওরা। আমেরিকা, ইউরোপ থেকে হেন ব্যবহৃত দ্রব্যাদি নাই যা আমদানি হয় না। কনটেইনার ভরে পাঁচমিশালী জিনিস আসে, সেই সঙ্গে জুতা। ওদের বাড়িতে জুতো সাজিয়ে রাখার শো-কেস একটি পরিচিত আসবাব।

পরিধেয়
আধুনিক লাইবেরিয়ানরা পরিধেয় পছন্দে পুরাপুরি পশ্চিমাদের কপি করে। প্রায়শ:ই তারা স্থানীয় ও আফ্রিকান পোশাকের একটা মিশেল দিয়ে দেয়। তবে একটু প্রবীণ  নারী পুরষরা আফ্রিকান পোশাকেই স্বাচ্ছন্দবোধ করে। নারীরা মাথায় একখন্ড কাপড় দিয়ে নানা ষ্টাইলে বাহারি পাগড়ির মত বাঁধে। তরুণরা জিন্স প্যান্ট, টি-শার্ট আর তরুণীরা জিন্স প্যান্ট সাথে টপ হিসেবে টি-শার্ট বা অন্য কোন পছন্দসই টপ পরে।

মাস্তানি ও চাঁদাবাজি
দুটি বস্তু এখনও লাইবেরিয়ার জনজীবনে অনুপস্থিত। একটি হলো মাস্তানিজম অন্যটি রাজনৈতিক দলের ঠাংগাড়ে বাহিনী। ফলে চাঁদাবাজি নেই। বাড়ি বানাতে, ব্যবসা করতে, রাস্তা-ঘাট বানাতে, ঠিকাদারি করতে মাস্তানদের চাঁদা দেওয়ার কোন বিষয় নেই।

উৎসব
২৫শে  ডিসেম্বর  ‘ক্রিসমাস  ডে’  নি:সন্দেহে  লাইবেরিয়ানদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে সবচেয়ে বড় উৎসব। ডিসেম্বর মাস পড়তেই ক্রিসমাসের আমেজ শুরু হয়ে যায়। প্রবাসীরা দেশে ফিরতে শুরু করে। এতবেশি ডলার বাজারে ঢোকে যে ডলারের দাম ৮-১০ টাকা পড়ে যায়। ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ থেকে ডিমের দাম তুঙ্গে ওঠে। নানা জাতের খাদ্যে ডিম ব্যবহার করাতে এটি হয়।
পুরো শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। দালানকোঠার ঘষামাজা, চুনকাম করা হয়। সরকারি তাগিদ তো আছেই, ব্যক্তিগতভাবেও তাগিদ অনুভব করে। প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, দোকান পাটে, অফিসে ক্রিসমাস ট্রি ও সান্তাক্লজ স্থাপিত হয়। বড়দিনে ছোট-বড় সকলে নতুন জামা পড়ে এ ওর বাড়ি বেড়ায়। ঘরে তৈরি খাবার, ফাস্টফুড, কোক অফার করে। বেলা ১২টার দিকে সবাই সেজেগুজে চার্চে উপস্থিত হয়। সন্ধায় সরকারি বড় অফিস, ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্র তিষ্ঠানে আলোকসজ্জা করা হয়। রাস্তার মোড়ে, ক্লাবে, ক্যাফেতে, হোটেল, রেস্তোরায় নাচগান শুরু হয় সন্ধ্যায়। হরেক রকমের লিকারসহ পানাহার চলতে থাকে গভীর রাত পর্য ন্ত। উপহার হিসাবে আসে দামি মদের বোতল, মিষ্টান্ন , চকলেট ইত্যাদি।

পিঠাপুলি
হাতে বানানো বিস্কিট, পিঠা, তিলের খাজা বেশ সুস্বাদু। হাতে তৈরি বিস্কিটের মান যে কোন উন্ন ত ফ্যাক্টরিতে তৈরি বিস্কিটের চেয়ে ভালো বলা যাবে। বাজারের প্রান্তে বসে তেলে ভাজা গরম পিঠা দিয়ে রোববার সকালের নাস্তা করে অনেকেই। আর তিলের খাজাতো আমাদের দেশের ৬০-এর দশককের কথা মনে করিয়ে দিতো। এর গঠন, রং এবং স্বাদ হুবহু ৬০-এর দশকের তিলের খাজার কপি। কীভাবে এই মিল হতে পারে ভেবে পাইনি।

সবাই সাহেব
লাইবেরিয়ানরা হাত দিয়ে খাওয়া ভুলে গেছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও চামচে খাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জেনেছি কয়েক পুরুষ আগেও ওরা হাত ব্যবহার করতো। অতি দরিদ্রও যখন সাহেবি কায়দায় চামচ, কাটা চামচে খায় তখন দেখতে বেশ লাগে। যাই হোক, ওরা এক পাত্রে “তাবলীগ ধারায়” অনায়াসে খায়। পরিবারের সবাই তো একপাত্রে খাবেই। এছাড়া একজন খাচ্ছে দেখে পরিচিত অন্য যে কেউ অনুমতির অপেক্ষা না করে একই চামচ দিয়ে খাবার মুখে নেবে। কেউ কাউকে অফার করবে না কিন্তু অংশগ্রহণ করলে বাধা নেই।

চুল ও পরচুলা
বিধাতা আফ্রিকানদের প্র তি স্পষ্টতই কার্পণ্য করেছেন। প্রথমত এরা সবাই কালো এবং মিশকালো। দ্বিতীয়ত: পুরুষ মহিলা কারোরও মাথায় চুল নেই। মাথায় কোকরানো এবং শক্ত প্র কৃতির চুল গজায়  কিন্তু  লম্বা  বা  সোজা  করার  সুযোগ নোই। ফলে পুরুষরা মাথায় চুল রাখে না। চেছে ফেলে ন্যাড়া হয়ে থাকে। মেয়েরাও চুল লম্বা  করে না তবে অবধারিতভাবে পরচুলা পরে। একটা পরচুলা এক থেকে চার পাঁচ সপ্তাহ ব্যবহার করে। কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক দুই প্রকারই পরচুলা পাওয়া যায়। এর উপর ভিত্তি করে পশ্চিমা দেশে  রীতিমত  ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে উঠেছে এবং আফ্রিকায়  মাথায় পরচুলা সাঠানো  একটি চালু সেক্টর। মহিলাদের এক একটি পরচুলা ১০ থেকে ৫০ মার্কিন ডলার দাম পড়ে। চুল গাঁথতে আরও ৫-১০ মার্কিন ডলার। সুতরাং এটি মেয়েদের জন্য একটি ব্যয়বহুল বিষয়। কিন্তু অন্য খরচাদি কাটছাট করে হলেও এটা করে। পুরষদের ন্যাড়া  হবার সেলুন যেমন আছে তেমনি আছে মেয়েদের পরচুলা গাঁথার সুসজ্জিত করার সেলুন। ছোট্ট চুলের সাথে পরচুলার গোছা সুনিপুণভাবে গেঁথে দেওয়া হয়। এই কাজটি শুধু মেয়েরাই করে না, ছেলেরাও পেশা হিসাবে দক্ষতার সঙ্গে করে থাকে।  

খাওয়া দাওয়া
কি খায় না লাইবেরিয়ানরা - এক কথায় এভাবেই বলা যায়, পথ চলতে চলতে দেখবেন বিশাল সাইজের ইঁদুর, নাম না জানা বন্য প্রাণী, ম্যাগট বা বড় পোকা ইত্যাদি নিয়ে বিক্রির জন্য হাতে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুকুর থেকে শুরু করে হেন কোন প্রাণী নেই যে ওরা খায় না। দুটি মজার অভিজ্ঞতা বলি। কয়েকটা মুরগী কিনে পলিথিন ব্যাগে ভরে বাসায় এনে দেখি দুইটা মরে গেছে। মনটা খারাপ হলো। মহিলা বাবুর্চিকে বললাম, কি আর করা ফেলে দাও। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো- কেন আমি নেব। আমরা খাই সমস্যা নাই। একবার দেখি একটি ছেলে বড় সাইজের ডিসে করে রান্না মাংস ফেরি করে বিক্রি করছে। জিজ্ঞেস করলাম কিরে কিসের মাংস দেখি। ও বললো কুকুরের মাংস। দুপুর পর্য ন্ত  অর্ধে ক বিক্রি হয়েছে। সন্ধ্যে নাগাদ শেষ হয়ে যাবে। কাসাভা চালের বিকল্প হিসেবে আফ্রিকায় স্বীকৃত কিন্তু লাইবেরিয়ানরা ভাত পেলে কাসাভা খায় না। কাসাভা মাটির তলায় জন্মায়। অনেকটা শিমলাই আলুর মত। গাছের পাতা ও চেহারাও ছোট শিমুল গাছের অনুরূপ। একবুক উচুঁ হয় প্রাপ্ত বয়স্ক হলে। কাসাভা পোড়া দিয়ে রোস্ট করে এমনি বা কোন তরকারির সঙ্গে খায়। এছাড়া কাসাভার ছাতু দিয়ে পায়েশসহ হরেকরকম খাবার তৈরি করে। পোলাওয়ের মত ‘ঝালো রাইস’ ওদের প্রিয় খাবার। অনেকটা কাচ্চি বিরানির মত। ব্রয়লার মুরগীর মাংস সহযোগে রান্না করে। তরকারির মাছ বা মাংস বাদে বাকি ঝোল বা সবজি অংশকে এরা বলে সুপ। প্লানটিন (কাঁচকলা পাকলে যেমন হয়) রোস্ট, ভুট্টা রোস্ট (ওরা বলে কর্ন রোস্ট) নিত্য সময়ের প্রধান খাবার। শাক হিসেবে আলুপাতা প্র ধান ও প্রি য়। কাঁচা বাজারে সারা বছরই এটি পাওয়া যায়। মহিলারা কুচি কুচি করে কেটে ওজন করে বা ভাগ দিয়ে বিক্রি করে। সিজনে শশা  প্রচুর পাওয়া যায় তবে অল্প বিস্তর সারা বছরই পাওয়া যায়। ব্রয়লার মুরগী প্রধানত: ব্রাজিল থেকে আসে। ডিম আসে ব্রাজিল ও চীন থেকে। গরু, খাসি আসে গিনি ও আইভরি কোস্ট থেকে। গরু ও খাসির মাংসের দাম বেশ চড়া। শহরের সর্ব ত্র বিকেল দিকটায় বিভিন্ন মাছের রোষ্ট পাওয়া যায়। আস্ত মাছকে মশলা সহযোগে কয়লায় পুড়িয়ে এটি করা হয়। খেতে বেশ সুস্বাদু। বৈকালিক নাস্তায় এটি একটি  আকর্ষ ণীয় আইটেম।

লাইবেরিয়ানরা অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষুধা সহ্য করতে পারে। স্রেফ এক বেলা খেয়ে ২৪ ঘন্টা থাকতে পারে। চা প্রায় খায়না বললেই চলে।  চায়ের  বদলে জুস অফার করলে খুশি হয়। মুসলিম জনগোষ্ঠির মধ্যে চা, সিগারেটের এর চল বেশি, পান সুপারির প্র চলন নেই। তবে প্রায় সবাই ‘কোলা নাট’ খেয়ে কাচা সুপারির মত হাল্কা নেশা করে। সবার পকেটে বা ব্যাগে এই ‘কোলা নাট’ দেখা যায়। যত্রতত্র বিক্রিও হয়। এরা খুব ঝাল প্রিয়। শুধু মরিচ ভর্তা একটি আইটেম হিসাবে খাবার মেনুতে প্রায়ই থাকবে। এসিড ও পেটের আলসারে প্রায় সবাই ভোগে তবু ঝাল খাবে, আর এসিড ট্যাবলেট (এনটাসিড) খাবে।

লাপ্পা ও মাথায় বোঝা বহন
আমাদের দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টির মধ্যে যেমনটি দেখা যায়, পিঠে কাপড় পেচিয়ে মহিলারা বাচ্চা বহন করে লাইবেরিয়ানরাও তাই করে। পিঠে বাচ্চা বেঁধে তারা মাইলের পর মাইল হাঁটে বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে। আরেকটি বিশেষত্ব হলো মাথায়ভার বহন/মাথার ভার ব্যালান্স করে হাঁটার পারদর্শিতা, না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। মাথায় বোঝা নিয়ে রীতিমত ঝগড়া করতে দেখেছি। উঁচু নিচু পথ চলা তো আছেই। প্রতিটি গ্রামীণ নারী আধা শহুরে নারীদের (অফিস আদালতে চাকরী  করে এমন মহিলা ছাড়া) প্রত্যেকের সঙ্গে একটা লাপ্পা থাকবে। লাপ্পা হচ্ছে একখন্ড বড় সাইজের ওড়নারমত বা সেলাইবিহীন লুঙ্গির মত কাপড়, যা দিয়ে কোমর থেকে হাটু পর্য ন্ত পেচানো যায়। অনেক সময় দেখা যায়, জিন্সের ফুলপ্যান্ট পরে আছে কিন্তু তার উপর লুঙ্গির মতকরে লাপ্পা পেচানো। লাপ্পার উৎকৃ ষ্ট ব্যবহার দেখেছি দীর্ঘ পথ চলা নারী  যাত্রীদের  মধ্যে। হয়তো ৫০/৬০ কিলোমিটার পথ চলার পর যাত্রীরা ড্রাইভারকে থামতে বললো ‘পিপি’ করবে বলে। পিপি মানে প্রশ্রাব আর পেপে মানে মলত্যাগ। পুরুষরা রাস্ত ার পাশে দাঁড়িয়েই পিপি সারবে আর ময়েরা রাস্তার পাশেই একটু জঙ্গলে ঢুকে লাপ্পা পেঁচিয়ে অনায়াসে পিপি সারবে।

এই বিভাগের আরো খবর

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাসৈনিক হালিমা খাতুনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভাষাসৈনিক ও সাহিত্যিক হালিমা খাতুনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানালো সর্বস্তরের মানুষ। সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে তার...

কলকাতায় দুই বাংলার শিশুদের আঁকা ছবি নিয়ে চিত্র প্রদর্শনী

ডেস্ক প্রতিবেদন: হাতে মোবাইল ফোন, টেলিভিশনে দিন-রাত চোখ- অনেকেই আবার ফেসবুকে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর যারা একটু পড়াশোনায় বেশি মনযোগী তারা...

নজরুল শুধু জাতীয় কবি নন, জাগরণের-সাম্যের কবি: রাষ্ট্রপতি

ন্যাশনাল ডেক্স: রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন নজরুল শুধু বাংলার জাতীয় কবি নন, তিনি জাগরণের কবি, সাম্যের কবি। তার লেখনী যুগ যুগ ধরে...

অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের প্রতি আগামীকাল সর্বস্তরের শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদন : চলে গেলেন ভাষা সংগ্রামী, খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও জাতীয় অধ্যাপক মুস্তফা নূর উল ইসলাম। গতরাতে নিজবাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয় হয়।...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is