নার্গিসকে নিয়ে নজরুলের প্রথম ও শেষ চিঠি

প্রকাশিত: ০৫:৩৩, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আপডেট: ০৫:৩৩, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অনলাইন ডেস্ক: নার্গিস আসার খানম (সৈয়দা খাতুন) বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী। তবে তাদের বিয়ে নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।

কবি তার ছায়ানট; পূবের হাওয়া; চক্রবাক কাব্য গ্রন্থের অনেক কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে রচনা করেন। ছায়ানটের মোট ৫০টি কবিতার মধ্যে "বেদনা অভিমান'; "অবেলায়"; "হার মানা হার"; "অনাদৃতা"; "হারামনি"; মানস বধু; বিদায় বেলায়; পাপড়ি খেলা; ও বিধূর পথিকসহ মোট ৯টি কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে লেখেন।

নার্গিস আসার খানম বর্তমান কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর গ্রামের খাঁ বাড়ির আসমাতুন্নেসার মেয়ে। তার পিতার নাম মুন্শী আবদুল খালেক। নার্গিসের মামা আলী আকবর খান নজরুলের সাথে কলকাতায় পাশাপাশি থাকতেন। তিনি নজরুলকে তার বাড়ি কুমিল্লায় নিয়ে যান ১৯২১ সালে, উদ্দেশ্য ছিল তার পরিবারের কোন মেয়ের সাথেই নজরুলের বিয়ের ব্যবস্থা করা। নজরুলও নার্গিসকে পছন্দ করেন এবং বিয়েতে রাজি হন।

এ সময় আলী আকবর খান নজরুলকে তার কলকাতার কোন বন্ধুদের চিঠি দিতেন না, এমনকি নজরুলের চিঠিও কলকাতায় পোস্ট করার আগেই সরিয়ে ফেলতেন। বিয়ের প্রায় কিছুদিন আগে নজরুল এই ঘটনাগুলো জানতে পারেন। নার্গিসের দ্বিতীয় স্বামী কবি আজিজুল হাকিম পরবর্তিতে সেই চিঠিগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করেন।

১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৩ আষাঢ় শুক্রবার কবির সাথে নার্গিসের বিয়ের দিন ধার্য হয়। সেদিন বিয়ের আকদ্ সম্পন্ন হলেও (কিছু ঐতিহাসিক দ্বিমত পোষণ করেন) কাবিনে ঘর জামাই থাকার শর্ত নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। নজরুল বাসর সম্পন্ন না করেই নার্গিসকে ছেড়ে দৌলতপুর ত্যাগ করেন। এরপর নজরুলের সাথে নার্গিসের দেখা হয় ১৫ বছর পরে। তখন তাদের আনুষ্ঠানিক বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। কবি আজিজুল হাকিমের সাথে নার্গিসের দ্বিতীয় বিয়ে সম্পন্ন হয়।

তবে নার্গিসকে নিয়ে নজরুলের প্রথম ও শেষ একটি চিঠি লিখেছিলেন যা নিচে দেয় হলো:

 

কল্যাণীয়াসু,

তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নব বর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাতে। মেঘ মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি এক বারিধারায় প্লাবন নেমেছিল, তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো। আষাঢ়ের নব মেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার। এই মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছিল কালিদাসের যুগে, রেবা নদীর তীরে, মালবিকার দেশে, তার প্রিয়ার কাছে। এই মেঘপুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চার।

এই আষাঢ় আমায় কল্পনার স্বর্গলোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে। যাক, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দেই। তুমি বিশ্বাস করো, আমি যা লিখছি তা সত্য। লোকের মুখে শোনা কথা দিয়ে যদি আমার মূর্তির কল্পনা করে থাকো,তাহলে আমায় ভুল বুঝবে- আর তা মিথ্যা।

 

তোমার উপর আমি কোনো ‘জিঘাংসা’ পোষণ করিনা –এ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি। আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি আসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি, তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না। আমি ধুমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না।

তোমার যে কল্যাণ রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালবাসার আঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজো স্বর্গের পারিজাত-মন্দারের মতো চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের সে আগুন-বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি।

তুমি ভুলে যেওনা আমি কবি, আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি। অসুন্দর কুৎসিতের সাধনা আমার নয়। আমার আঘাত বর্বরের কাপুরুষের আঘাতের মতো নিষ্ঠুর নয়। আমার অন্তর্যামী জানেন (তুমি কি জানো বা শুনেছ জানিনা) তোমার বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অনুযোগ নেই, অভিযোগ নেই, দাবীও নেই।

তোমার আজিকার রূপ কি জানিনা। আমি জানি তোমার সেই কিশোরী মূর্তিকে, যাকে দেবীমূর্তির মতো আমার হৃদয় বেদীতে অনন্ত প্রেম, অনন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। সেদিনের তুমি সে বেদী গ্রহণ করলেনা। পাষাণ দেবীর মতই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদিপাঠ। জীবন ভ’রে সেখানেই চলেছে আমার পূজা আরতি। আজকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা,ব্যর্থ ; তাই তাকে পেতে চাইনে। জানিনে হয়ত সে রূপ দেখে বঞ্চিত হব,অধিকতর বেদনা পাব, তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি।

দেখা? না-ই হ’ল এ ধূলির ধরায়। প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগদ্ধ, হতশ্রী। তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাস আমাকে চাও ওখান থেকেই আমাকে পাবে। লাইলি মজনুকে পায়নি, শিরি ফরহাদকে পায়নি, তবু তাদের মত করে কেউ কারো প্রিয়তমাকে পায়নি। আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতি পুরাতন কথা হলেও প্রেম সত্য। আত্মা অবিনশ্বর, আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারেনা। প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাকো, তাহলে তোমার মতো ভাগ্যবতী আর কে আছে ? তারি মায়া স্পর্শে তোমার সকল কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে।

দুঃখ নিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলেই সেই দুঃখের অবসান হয়না। মানুষ ইচ্ছা করলে সাধনা দিয়ে, তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুল রূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে। যদি কোনো ভুল করে থাক জীবনে, এই জীবনেই তাকে সংশোধন করে যেতে হবে; তবেই পাবে আনন্দ মুক্তি; তবেই হবে সর্ব দুঃখের অবসান । নিজেকে উন্নত করতে চেষ্টা করো, স্বয়ংবিধাতা তোমার সহায় হবেন। আমি সংসার করছি, তবু চলে গেছি এই সংসারের বাধাকে অতক্রম করে উর্ধ্ব লোকে। সেখানে গেলে পৃ্থিবীর সকল অপূর্ণতা, সকল অপরাধ ক্ষমা সুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্তিতে দেখা যায়।

হঠাৎ মনে পড়ে গেল পনর বছর আগের কথা। তোমার জ্বর হয়েছিল, বহু সাধনার পর আমার তৃষিত দুটি কর তোমার শুভ্র ললাট স্পর্শ করতে পেরেছিল; তোমার তপ্ত ললাটের স্পর্শ যেন আজো অনুভব করতে পারি। তুমি কি চেয়ে দেখেছিলে? আমার চোখে ছিলো জল, হাতে সেবা করার আকুল স্পৃহা, অন্তরে শ্রীবিধাতার চরণে তোমার আরোগ্য লাভের জন্য করুণ মিনতি। মনে হয় যেন কালকের কথা। মহাকাল যে স্মৃতি মুছে ফেলতে পারলেননা। কী উদগ্র অতৃপ্তি, কী দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ারই সেদিন এসেছিল। সারা দিন রাত আমার চোখে ঘুম ছিল না।

যাক আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষে রশ্মি ধরে ভাটার স্রোতে, তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করোনা। তোমাকে লিখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। যেখানেই থাকি বিশ্বাস করো আমার অক্ষয় আশির্বাদ কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখী হও, শান্তি পাও, এই প্রার্থনা। আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস করো, আমি তত মন্দ নই, এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ।

 

ইতি
নিত্য শুভার্থী

নজরুল ইসলাম

এই বিভাগের আরো খবর

নওয়াজুদ্দিনের সাথে আথিয়া শেঠির বিয়ে

বিনোদন ডেস্ক: বলিউডের জনপ্রিয়...

বিস্তারিত
কৌশিক গাঙ্গুলির নতুন ছবিতে জয়া

বিনোদন ডেস্ক: কলকাতার নির্মাতা কৌশিক...

বিস্তারিত
অস্কারজয়ী অভিনেত্রী জেন ফন্ডা আটক

বিনোদন ডেস্ক: অস্কারজয়ী ৮১ বছর বয়সী...

বিস্তারিত
সালমান খানের বাড়ির সামনে এলাহীকাণ্ড

বিনোদন ডেস্ক: ‘বেড ফ্রেন্ড ফরএভার...

বিস্তারিত
মাগুরায় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা 

মাগুরা প্রতিনিধি: মাগুরার ফটকি নদীতে...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *