সগিরা মোর্শেদের খুনিদের রক্ষায় যে ছিনতাই নাটক

প্রকাশিত: ০২:২৭, ১৬ জানুয়ারি ২০২০

আপডেট: ০৯:২৫, ১৬ জানুয়ারি ২০২০

অনলাইন ডেস্ক: ৩০ বছর আগে আলোচিত সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলায় চার জনকে আসামী করে আদালতে ১৩শ’ নয় পাতার চার্জশিট দাখিল করেছে পিবিআই। সংস্থাটি বলছে, এটি পারিবারিক কলহে পরিকল্পিত হত্যা।

আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির প্রধান বনজ কুমার মজুমদার এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, যে রিকসায় গুলিবিদ্ধ হয়, সেই রিকসা চালক আবদুস সালামকে খুঁজে বের করা হয়েছে। পরে তার বর্ণনায় বেরিয়ে আসে খুনিদের চেহারার বর্ণনা। আরো কিছু আলামতের সাথে মিল পাওয়ায় পারিবারিক কলহের ঘটনা উন্মোচন হয়।

সাগিরা মোর্শেদ হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনায় ছিলো তার বড় ভাসুর, জা ও জার ভাই রেজওয়ান। আর গুলি করে ভাড়া করা খুনি মারুফ রেজা। অভিযুক্ত সবাই ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

ত্রিশ বছর আগে সগিরা মোরশেদকে ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে ১৯৮৯ সালের ২৫শে জুলাই বিকেলে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেদিন রিকশায় করে যাওয়ার পথে সগিরার অলংকার ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় বাধা পেয়ে তাকে গুলি করে দু'জন লোক।

এটা আসলে ছিনতাই ছিল না, ছিল এক পরিকল্পিত হত্যাকান্ড, যার পেছনে ছিল পারিবারিক দ্বন্দ্ব।

ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন নিহতের ভাসুর ডা. হাসান আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন, মিসেস শাহীনের ভাই আনাস মাহমুদ রেজওয়ান, মারুফ রেজা। তারা চারজনই এখন কারাগারে।

তথ্য প্রমাণ এবং নানা চাপের মুখে বছরের পর বছর ঝুলে ছিল এই মামলার তদন্ত কাজ। তবে পিবিআই এর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অবশেষে প্রায় তিন দশক পর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এই চার ব্যক্তি।

তদন্তের জন্য ১১ জুলাই আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন- পিবিআইকে দায়িত্ব দেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের এক দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এসব সব তথ্য।

সগিরা মোরশেদকে হত্যার পরই ওই সময়ের এক মন্ত্রীর চাপে খুনের ঘটনাকে ছিনতাই নাটক সাজায় গোয়েন্দা পুলিশ। এক আত্মীয় এ ঘটনায় জড়িত থাকায় মন্ত্রী প্রভাব খাটিয়ে ভিন্ন খাতে নিয়ে যান মামলার তদন্ত। হত্যার এক বছরের মাথায় ১৯৯০ সালে সগিরা হত্যা মামলায় মন্টু মণ্ডলকে আসামি করে চার্জশিট দেয়া হয়। তবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সময় দু’জন ঘটনাস্থলে থাকলেও আসামি কেন একজন হবে মামলার বিচার কাজ চলাকালে এমন প্রশ্ন ওঠে।

এমন প্রেক্ষাপটে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। আদালত কেন মামলাটির অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন- এর বিরুদ্ধে রিট করেন এক নারী। তখনই প্রশ্ন ওঠে কেন ওই নারী এমন রিট করলেন- যার সঙ্গে মামলার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। পরে গত বছরের জুলাইয়ে আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পায় পিবিআই। তদন্তের শুরুতে পিবিআই ওই রিটকারী নারীর ব্যাপারে খোঁজ নেয়। তখন বেরিয়ে আসে, ওই নারী হলেন শুটার মারুফ রেজার মা।

এছাড়া ৩০ বছর পর প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাওয়ালাকে খুঁজে বের করা হয়। সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন তিনি। হত্যাকারী দু’জনের চেহারা কী রকম ছিল সে বর্ণনাও নেয়া হয় তার কাছ থেকে। তাতে মারুফ রেজার সঙ্গে তার বর্ণনার মিল পাওয়া যায়। এরপর যে অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি করা হয়েছিল, তার মালিকের নাম খুঁজে বের করে পিবিআই। এ অস্ত্রের মালিকের নাম ছিল হরহর মুন্না। ২-৩ বছর আগে বন্দুকযুদ্ধে মুন্না মারা যায়।

পিবিআই ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. শাহাদাত হোসেন জানান, আনাস মাহমুদ রেজওয়ান নামে একজনকে গত ১০ নভেম্বর গ্রেফতারের পর দু’দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। এরপর ১৩ নভেম্বর গ্রেফতার করা হয় মারুফ রেজাকে। তারা দু’জন হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।

এছাড়া ১২ নভেম্বর ধানমণ্ডির বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় সগিরা মোরশেদের ভাসুর ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিনকে। পরদিন খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন তারা।

তিনি জানান, এ ঘটনায় মন্টু মণ্ডলকে আসামি করা হলেও তার অব্যাহতি চাওয়া হবে। তিনি জানান, পারিবারিক প্রতিহিংসার শিকার হন সগিরা। ঘরোয়া নানা বিষয়-আশয় নিয়ে সগিরা-মাহমুদার মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। তাই সগিরাকে শায়েস্তা করতে স্বামী বারডেমের চিকিৎসক হাসান আলী চৌধুরীর সঙ্গে শলা-পরামর্শ করে মাহমুদা। স্ত্রীর কথামতো ছোট ভাইয়ের স্ত্রী সগিরাকে হত্যার পরিকল্পনা করে সে। ২৫ হাজার টাকায় খুনি ভাড়া করা হয়।

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, স্বামীর সঙ্গে রাজারবাগ এলাকায় নিজেদের বাড়িতে থাকতেন সগিরা মোরশেদ। তিনি চাকরি করতেন বিআইডিএসের গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে। তাদের তিন মেয়ে। এক মেয়ে সারাহাত সালমা ভিকারুননিসা স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তখন। ঘটনার দিন মেয়েকে স্কুল থেকে আনার উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন সগিরা। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের একটু আগে মারুফ রেজা মোটরসাইকেল দিয়ে সগিরার রিকশাটি আটকায়।

মারুফ সগিরা মোর্শেদের হাতব্যাগ নিয়ে নেয় এবং হাতের চুড়ি ধরে টানাহেঁচড়া করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত মারুফ রেজার সহযোগী আনাস মাহমুদ রেজওয়ানকে চিনে ফেলেন সগিরা। তখন সগিরা তাকে জানান, এ আমি তো তোমাকে চিনি, তুমি এখানে কেন? একথা বলার পরপরই মারুফ রেজা কোমর থেকে পিস্তল বের করে একটি গুলি করে, যা সগিরা মোর্শেদের হাতে লাগে। এরপর সে সগিরা মোর্শেদকে আরও একটি গুলি করে, যা সগিরার বুকের বাঁ পাশে লাগে। সগিরা মোর্শেদ রিকশা থেকে পড়ে যান। তখন মারুফ রেজা আরও দুটি ফাঁকা গুলি করে মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে যায়।

শুরু থেকে পুরো তদন্ত তদারকির দায়িত্বে ছিলেন পিবিআই এর পুলিশ সুপার মোঃ. শাহাদাত হোসেন।

এই বিভাগের আরো খবর

২১শে ফেব্রুয়ারিতে হুমকি নেই: ডিএমপি কমিশনার

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা মহানগর পুলিশ...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *