ক্ষমতা হারাচ্ছেন ট্রাম্প?

প্রকাশিত: ০৫:৩৯, ১৯ জানুয়ারি ২০২০

আপডেট: ০৫:৩৯, ১৯ জানুয়ারি ২০২০

ফারহীন ইসলাম টুম্পা: নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বেফাঁস মন্তব্য আর হঠকারি সিদ্ধান্তের জন্য আলোচিত-সমালোচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কেউ পছন্দ করুক বা না করুক তাতে কখনোই থেমে থাকেনি তার কথার তুবড়ি আর টুইটের জোয়ার।

মার্কিন পার্লামেন্টের নিæকক্ষ- প্রতিনিধি পরিষদে তাকে পদচ্যূত করা বা ইম্পিচ প্রস্তাব পাস হয়েছে। প্রস্তাবটির ওপর এখন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে শুনানি চলছে। এতে কিছুটা হলেও ধাক্কা খেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এমনটা মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের অনেকে। তবে প্রশ্ন হলো এই অভিসংশন প্রস্তাব বিতর্র্কিত অবস্থান থেকে কতোটা সরাতে পারবে তাকে। আর ট্রাম্প কি সত্যিই ক্ষমতা হারাচ্ছেন?

বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্কিন সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিশংসিত হলে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়তে হবে ট্রাম্পকে। তবে সাধারণ হিসেব বলছে, ট্রাম্পের বিপাকে পড়ার আশঙ্কা খুবই কম। কারণ সিনেটে তার দল রিপাবলিকানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মার্কিন সংবিধানে উভয় কক্ষকে অধিকার দেয়া হয়েছে একজন প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করার। মার্কিন সংবিধানের আর্টিকেল ২, সেকশন ৪-এ উলে­খ আছে, একজন প্রেসসিডেন্ট যদি রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা বিশ্বাসঘাতকতার মতো কাজ করেন, ঘুষ গ্রহণ বা সংবিধান লঙ্ঘন কিংবা বিধিবহির্ভূত কাজ করেন, তাহলে তাকে ‘ইমপিচ’ বা অভিশংসন করা যাবে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ মূলত দুটি। ক্ষমতার অপব্যবহার ও কংগ্রেসের কাজে বাধা দেয়া। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। দুটি অভিযোগেই প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হন ট্রাম্প।

প্রতিনিধি পরিষদের ভোটাভুটিতে দেখা গেছে, সেখানে ৪৩৫ জন প্রতিনিধির মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন ২৩০ জন সদস্য, আর পক্ষে ছিলেন ১৯৭ জন। অন্যদিকে কংগ্রেসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে তার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন ২২৯ জন আর পক্ষে ১৯৮ জন। অন্যদিকে সিনেট সদস্য হচ্ছেন ১০০ জন। এর মধ্যে রিপাবলিকানদের সংখ্যা ৫৩, আর ডেমোক্রেটদের ৪৭।

আগামী ২১ জানুয়ারি সিনেটে এ বিষয়ৈ ভোটাভুটি হবে। তবে সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগের ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, যখন তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসতে থাকে এবং কংগ্রেস তা তদন্ত করতে চায় তখন ট্রাম্প এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি তথ্য প্রমাণ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও করেন।

আর দ্বিতীয় অভিযোগটি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী জো বাইডেন ও তার ছেলের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের একটি গ্যাস কোম্পানির দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে ফোন করে চাপ দেয়ার জন্য। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি জানায়, তাদের প্রাপ্ত তথ্যমতে ২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত জো বাইডেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন তার ছেলে হান্টার বাইডেন ইউক্রেনের গ্যাস কোম্পানি বুরিসমা হোল্ডিংসে কর্মরত ছিলেন। এ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মিকোলা জ্লোচেভ্স্কি। যিনি ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের ঘনিষ্ঠ এবং তৎকালীন মন্ত্রীও।

প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের পতনের পর তার সঙ্গে জেলাচেভ্স্কিও দেশ ছাড়েন। অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে ইউক্রেনে। ২০১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ফোন করে হান্টার বাইডেন এবং তার বাবা জো বাইডেনের ব্যাপারে তদšন্ত করার অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে একথা  ট্রাম্প নিজে স্বীকারও করেন। আর বিষয়টি চলতি বছর নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া একজন  প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর জন্য শুধু অনাকাঙিক্ষতই নয় বরং অনৈতিক বলেও মত অনেকের।  

তবে বরারবই ট্রাম্প এসবের তোয়াক্কা করেন না বলেই মনে করা হয়। তিনি যা ভালো বোঝেন, তাই করেন। অনেক অভিযোগ থাকা সত্তে¡ও ২০১৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হন ট্রাম্প। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে অভিসংশন প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, এটি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ট্রাম্প এই অভিশংসন প্রক্রিয়াকে ‘ভুয়া’ বললেও মার্কিন গণমাধ্যমে এর প্রশংসা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসও রায় দিচ্ছে প্রেসিডেন্টের পক্ষেই। এর আগে, প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসন এবং বিল ক্লিনটন প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেও শেষ পর্যন্ত পদ ছাড়তে হয়নি তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের ১৭তম প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসনের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৮৬৮ সালে। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তখন প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেও সিনেটে এক ভোটের জন্য তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো যায়নি।

এরপর ১৯৭২ সালে তৎকালীন রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয় ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে। ওয়াশিংটন ডিসিতে ডেমোক্রেটিক পার্টির সদর দফতরে গুপ্তচর যন্ত্র দিয়ে নজরদারি করেছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। তদন্তে আড়িপাতার পক্ষে প্রমাণও মেলে। প্রায় দুই বছর ওই ঘটনা চাপা দিতে পারলেও ১৯৭৪ সালে তার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করে মার্কিন কংগ্রেসের হাউস জুডিশিয়ারি কমিটি। তবে চূড়ান্ত ভোটাভুটির আগেই পদত্যাগ করেন নিক্সন। ধারণা করা হয়, তিনি পদত্যাগ না করলে অভিশংসিত হতেন।

এরপরই আসে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নাম। ১৯৯৮ সালে হোয়াইট হাউস ইন্টার্ন মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের জের ধরে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পার পেয়ে যান তিনি। আজকে ট্রাম্পের অবস্থা অনেকটাই সেরকম। প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেও সিনেটে তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সেখানে তিনি পার পেয়ে যেতে পারেন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

অভিযোগ যাই থাক অনেকেই আবার ট্রাম্পের পক্ষে মত দিয়ে বলছেন, সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হলো এমন একটি সময়, যখন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা না দিয়ে বিশ্বে উত্তেজনা কিছুটা হলেও হ্রাস করেছেন। একইসঙ্গে চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি করে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়ে আনতে পেরেছেন।

তবে শেষ পর্যন্ত যাই ঘটুক, ট্রাম্পের নৈতিক পরাজয় হয়েছে বলেই মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। কেননা নিজের মতো করে ক্ষমতা পরিচালনা করার পাশাপাশি তিনি কখনোই কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আইনের তোয়াক্কা করেন না। অনেক বির্তকের সঙ্গে এবার যুক্ত হলো অভিশংসন প্রক্রিয়াও। তাই ক্ষমতা না হারালেও অভিশংসন প্রক্রিয়া কোনো সম্মান বয়ে আনবে না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য তা বলাই যায়।

 

এই বিভাগের আরো খবর

ট্রাম্পের সফরের মাঝেই রণক্ষেত্র দিল্লি

অনলাইন ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট...

বিস্তারিত
চরকা কাটলেন ট্রাম্প ও মেলানিয়া

অনলাইন ডেস্ক: চরকা কেটে গান্ধীকে...

বিস্তারিত
ভারতের মাটিতে ট্রাম্পকে উঞ্চ অভ্যর্থনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের...

বিস্তারিত
করোনাভাইরাস:  আরও ১৫৭ জনের মৃত্যু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রাণঘাতি...

বিস্তারিত
দু’দিনের সফরে ভারতে পৌঁছেছেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দুইদিনের সফরে আজ...

বিস্তারিত
দক্ষিণ কোরিয়ায় উদ্বেগজনক হারে ছড়াচ্ছে করোনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রাণঘাতী করোনা...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *