ভালোবাসার কাছে তুচ্ছ করোনা বাঁধা!

প্রকাশিত: ০৯:১৯, ৩০ মার্চ ২০২০

আপডেট: ০৯:১৯, ৩০ মার্চ ২০২০

ফারহীন ইসলাম: পরিবারের সাথে কায়রো থাকবেন নাকি তাঁর ভালবাসার কাছে কানাডায় যাবেন। দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ছিল। কিন্তু ভাবছিলেন, মহামারীর এই সময়ে ভ্রমণ করা আর আত্মহত্যা বা তার চেয়েও খারাপ হওয়া একই কথা। বলছিলেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয় নাগরিক ইহাব বোরাই। করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার আগে শেষ ফ্লাইটে যিনি মিসর থেকে কানাডায় গেছেন শুধুমাত্র ভালোবাসার মানুষের টানে।

ইহাব বোরাইয়ের ভাষায়, মহামারীর মতো পরিস্থিতিতেও প্রেমিকের আচরণই করেছেন তিনি। যেভাবেই হোক পৌঁছাতে চেয়েছেন ভালোবাসার মানুষের কাছে। মিসর থেকে কানাডায় ভালোবাসার মানুষের কাছে যাওয়ার সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেছেন ইহাব বোরাইয়ে। যা মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এ প্রকাশ হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে কোনো স্থানই এখন নিরাপদ নয়। নিজেকে গৃহবন্দী করার থেকে ভালো কোনো উপায় নেই এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে। এরপরও ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে নির্বোধের মতো কাজ করতে বাধ্য করায়। যেমনটা করেছেন ইহাব বোরাইয়ে তার ভালোবাসার মানুষ ইতালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ফ্রানচেসকা ব্রুনদোচিনির জন্য। করোনা রুখতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হলেও ভালোবাসার টানে সেই বাধা তুচ্ছই করেছেন তারা।

ইহাব বোরাইয়ের বান্ধবী ফ্রানচেসকা কানাডার কুইবেক সিটির পোস্টডকে কাজ করেন। তিনি ওই শহরে নতুন। করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, সেই খবরে ইহাব ও ফ্রানচেসকা দুজনেরই ভাবনা ছিল, এটা কয়েক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলতে পারে। দূরত্ব, অনিশ্চয়তা ও ফ্রানচেসকার ইতালীয় মায়ের ইতালি থেকে বারবার ফোন করে আতঙ্কিত হওয়ার ঘটনায় ইহাব ফ্রানচেসকার কাছে কানাডায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও করোনা পরিস্থিতিতে অনেকটা অনিশ্চয়তায়ই ছিল কায়রো থেকে কানাডা পর্যন্ত ফ্লাইট পাওয়া।

এমনকি এই পরিস্থিতিতে পরিবারকে ফেলে আসার বিষয়টিও যন্ত্রনা দিচ্ছিল ইহাবকে। এর ওপর তার মা-বাবা দুজনের বয়সই ষাটের উপর। ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানা স্বাস্থ্য জটিলতার কারনে করোনা আক্রান্তের ব্যাপক ঝুঁকিতেও রয়েছেন তারা। ইহাবের মনে বারবার উঁকি দিচ্ছিল সংশয়। মিসরে তাঁদের ছেড়ে আসার পর যদি আর কখনো দেখা না হয়! যদিও তার মা-বাবাও তাকে ফ্লাইট খুঁজে নিতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। তার বান্ধবী ফ্রানচেসকা এমন পরিস্থিতিতে কানাডায় একা আছেন, বিষয়টি তাদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলছিল।

এদিকে, মার্চ থেকে কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হবে এমন খবরে টিকিট পাওয়ার বিষয়টিও ছিল অনিশ্চিত। যা পাওয়া গেল, সেগুলোর দামও হু হু করে বেড়ে যাচ্ছিল। ৭০০ ডলারের টিকিটের দাম হয়ে গেল ৩ হাজার ডলার। এমন অবস্থায় অলৌকিক কিছুর আশায় মিসরের বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ ইহাব ভাবছিলেন, কানাডা সরকার যদি আটকেপড়া কানাডীয়দের নেয়ার জন্য ফ্লাইট পাঠায়, তাহলেই হয়তো তিনি কানাডার ফ্লাইট পাবেন। অবিশ্বাস্যভাবে এমনটাই ঘটলো। বিমানবন্দর বন্ধের কয়েক ঘণ্টা আগে কানাডা যাওয়ার সবশেষ ফ্লাইটে তার টিকিট নিশ্চিত করে ফোন এল।
 
বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হতে ইহাব দেখলেন অলংকারের একটি দোকান খোলা। এ সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় ছাড়া এমন জিনিসের দোকান খোলা থাকাটা বেশ অদ্ভুত ব্যাপার। তার মনে হলো অবিশ্বাস্যভাবে টিকিট পাওয়ার মতোই অলংকারের দোকান খোলা পাওয়ায় তার ভাগ্য। রাস্তায় দেখলেন সেনা টহল চলছে। কারফিউ শুরু হচ্ছে। বিমানবন্দরে পৌঁছেও দেখলেন লোকজনের উপস্থিতি কম। তবে যেহেতু সামাজিক দুরুত্ব বজায় রাখার বিষয়টি মাথায় ছিল, তাই লোকজন কম থাকার বিষয়টি এক রকমের স্বস্তি দিল তাকে। ফ্লাইটে বেশির ভাগ যাত্রী মাস্ক পড়া ছিলেন। এই সময়ে সর্দি কাশি রয়েছে, এমন কারও পাশে বসা খুব বাজে একটা অবস্থা, এমনটাই ভাবছিলেন ইহাব। এরমধ্যেই একজন ৭২ বছর বয়সী মা ও ৩৮ বছর বয়সী মেয়ের মাঝখানে বসলেন ইহাব।
 
তবে ওই মা মাস্ক পরে থাকলেও তাঁর নাক দিয়ে পানি পড়ছিল। এমনকি কাশছিলেন তিনি। আর মেয়েটির সুরক্ষামূলক কোনো ব্যবস্থা ছিলনা। এই সময়ে ভ্রমণঝুঁকি এড়াতে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সচেতনতা ছিলনা মেয়েটির মধ্যে। ফ্লাইটের পুরো সময় ওই মায়ের প্রতিটি কাশি তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে তিনিও সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছেন। কিছুক্ষণ পর ইহাব ওই মাকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি ঠিক আছেন কিনা। মহিলাটি বললেন, তার ঠান্ডা লেগেছে তবে তিনি ঠিক আছেন। ওই মা আরো বললেন, তিনি কানাডায় যাচ্ছেন তার মেয়ের কাছে, নাতি-নাতনির সঙ্গে থাকতে চান তিনি। আর করোনার এই পরিস্থিতিতে কানাডাই নিরাপদ মনে করেন।
 
ইহাব বোরাইয়ে, যার কানাডায় যাওয়ার একমাত্র কারণ তার ভালোবাসার মানুষটির কাছে যাওয়া। এরপরও তিনি ভাবলেন, তার শারীরিক এ ধরনের লক্ষণ থাকলে তিনি অবশ্যই ভ্রমণ করতেন না। এরপর কানাডার টরন্টোর বিমানবন্দর পৌঁছে দেখলেন, মানুষের সমাগম একদমই কম। কেননা কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নাগরিকদের দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ অবাক করার মতো বিমানবন্দরটি কায়রোর মতোই প্রায় জনশূন্য ছিল। তবে বিমান থেকে নামার পর দুই সপ্তাহের আইসোলেশনে থাকার বিষয়টি মনে করিয়ে দিলেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এরপর সাত ঘন্টা অপেক্ষা করলেন, কুইবেক সিটিতে যাওয়ার ফ্লাইটের জন্য।
তখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হওয়ার পরও সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ছিল, কায়রো থেকে টরন্টো, কুইবেক সিটি পর্যন্ত ন্যূনতম পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়নি ইহাবকে। কুইবেক নেমে ইহাব তার বান্ধবী ফ্রানচেসকাকে পেলেন। হাঁটু গেড়ে বসলেন তার সামনে। বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো হতভম্ব তখন ফ্রানচেসকা। ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ের আগ পর্যন্ত সে জানত না ইহাবকে সে আর দেখতে পারবে। অথচ ইহাব এখন তার সামনে হাটু গেড়ে বসে!

ফ্রানচেসকা ইহাবের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। একে অপরের মুখ থেকে মাস্ক সরিয়ে চুমু খেয়ে প্রস্তাবটিকে আনুষ্ঠানিকতায় রূপ দিলেন তারা। ইহাবের মনে তখন ছিল স্বস্তির নি:শ্বাস। এত ঝুঁকি নিয়ে এতটা পথ পাড়ি দেওয়া সার্থক মনে হলো তার কাছে। তখন ইহাবের মনে একবার হলেও সেই ভাবনা উঁকি দিল, ফ্রানচেসকা যদি ইহাবের প্রস্তাবে না করে দেয়, তাহলে কী হতো। তখন মিসরে ফিরে যাওয়ারও কোনো উপায় ছিলনা তার।
 
বান্ধবীকে আংটি পড়িয়ে দেওয়ার সময়ও ইহাবের মনে ছিল করোনা নিয়ে সংশয়ের কথা। মিসর থেকে আসার পথে যদি তিনি করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে এসে থাকেন। তবে তার সংস্পর্শে এখন সেই ঝুঁকিতে ফ্রানচেসকাও রয়েছেন। তবে তিনি আশা করছিলেন, তিনি এই ভাইরাসটিতে আক্রান্ত নন। এরপরই ইতালিতে থাকা ফ্রানচেসকার পরিবার ও বন্ধুদের তাদের বিয়ের সিদ্ধান্তের কথা জানান তারা। অভিনন্দনের জোয়ারে তারা ভেসে গেলেন আরো একবার।
 
ইহাব আরো জানান, বিমানবন্দর থেকে ফিরে বর্তমানে তিনি এবং ফ্রানচেসকা দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। আর করোনা সংকট কেটে যাওয়ার পর ইতালিতে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। তাদের এই দুজনের গল্প প্রমাণ করে করোনাভাইরাস তার নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে যতই পৃথিবীকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করুক না কেন, পৃথিবীর মানুষ ভালোবাসতে জানে। ভালোবাসা দিয়ে জয় করতে জানে যেকোনো প্রতিকূলতাকে।

 

এই বিভাগের আরো খবর

যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি শহরে কারফিউ

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: শ্বেতাঙ্গ...

বিস্তারিত
করোনা দুর্বল হচ্ছে; ইতালির চিকিৎসক

অনলাইন ডেস্ক: কোভিড-১৯ বর্তমান বিশ্বে...

বিস্তারিত
বিশ্বে প্রাণহানি ৩ লাখ সাড়ে ৭৩ হাজার

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: করোনা ভাইরাসে...

বিস্তারিত
বুরকিনা ফাসোয় হামলায় ৩৫ জন নিহত

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: পশ্চিম আফ্রিকার...

বিস্তারিত
যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে মৃত্যুর হার

অনলাইন ডেস্ক: বৈশ্বিক মহামারি করোনা...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *