করোনার বিরুদ্ধে ঘরে বসেই যেভাবে লড়েছি

প্রকাশিত: ০৯:৩৫, ২৩ জুন ২০২০

আপডেট: ০২:৫২, ২৩ জুন ২০২০

প্রবীর বড়ুয়া চৌধুরী: চীনের উহানে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয় গত বছরের শেষ দিকে। একবারের জন্যও চিন্তায় আসেনি পৃথিবীর প্রায় সবদেশ ঘুরে আমার দেশে আসতে পারে এই ব্যাধি। যতটুকু মনে পড়ে সেই সময়ে করোনার সংক্রমণের এই সংবাদগুলোর আকারও ছিল ছোট। আর সেই করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এখন বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের প্রধান খবর।  প্রিন্ট,অনলাইন বা টেলিভিশন সব মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি স্থান জুড়েই থাকছে। সারাবিশ্বে ঘুরতে ঘুরতে এই ভাইরাস আমাদের বিমানবন্দরের ফাঁক গলেও ঢুকে গেল। দেশের প্রধানমন্ত্রী মুখে প্রথম তিনজনের দেহে সনাক্ত হওয়ার খবরে শঙ্কিত হলাম। তবে তখনও পর্যন্ত নিজের বিপদটা সেভাবে টের পাইনি। সব আশঙ্কা সত্যি করে ভিনদেশি এই ভাইরাস আমাকেও আক্রান্ত করে এবং দীর্ঘসময় ঘরবন্দি করে রাখে।

নানান উপসর্গের এই ভাইরাস আমার ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করে। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম, শুরুতে কাশি, গলা ব্যাথাসহ নানা সমস্যা দেখা দিবে। তারপর জ¦র। কিন্তু, আমার শুরু শেষ থেকে। জ¦র দিয়ে। আর কাশি ও কফের সমস্যা জ্বরের এক সপ্তাহ পরে। আমি প্রথম জ্বরে আক্রান্ত হই ১০ই মে। করোনা কি-না তা পরীক্ষার জন্য যাই ১৫ই’মে। পরের দিনই নমুনা পরীক্ষা থেকে জানতে পারি আমার শরীর করোনা ভাইরাসের জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত। অর্থ্যাৎ করোনা পজিটিভ বা কোভিড-১৯। তার একদিন পর, সপ্তম দিনের বিকেল বেলা থেকে জ্বরের সাথে আমার শ্বাস কষ্ট, কফ, কাশির সমস্যা দেখা দেয়। শ্বাসকষ্ট ১২তম দিন পর্যন্ত আমায় বেশ ভোগায়। আর জ্বর ১৪তম দিনে পুরোপুরি ছেড়ে যায়। তবে এরপর কাশি আর কফের সমস্যা ছিল বেশ কিছুদিন।

আমার পুরোপুরি সুস্থ হতে সতের-আঠারো দিনের মত সময় লেগে যায়। তবে, এরপর বেশ কিছুদিন পর্যন্ত দুর্বল ছিল শরীর। পুরো একমাস আমি বাসায় নিজেই নিজের চিকিৎসা করে সুস্থ হয়ে উঠি। অনেকে শুনলে অবাকই হবেন এই সময়টাতে বাসায় একাই ছিলাম আমি। কারণ দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে আমি আমার মা, স্ত্রী ও একমাত্র শিশুপুত্র রোদ্দুর-কে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দিই। তাদের নিরাপদ রাখার কথা চিন্তা করে। শারীরিক লড়াইটা আমি একা করেছি। তবে এই লড়ায়ে সাফল্যের পিছনের অবদান আমার কর্মস্থল বৈশাখী টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ, সহকর্মী, বেশ কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু ও আমার কিছু কাছের মানুষের। তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতার জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে সর্বদা।

অসুস্থতার পুরো সময়টা জুড়ে আমি বুঝেছি, এ লড়াই যতটা করোনা ভাইরাসের সাথে, তার চেয়ে বেশি নিজের সাথে। আর এইজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা। কারণ এখনো পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোন টিকা বা ঔষধ আবিষ্কার হয়নি। তাই আপনাকে মানসিক দৃঢ়তার উপর ভর করে কোভিড-১৯ কে মোকাবিলা করতে হবে। মানসিক দৃঢ়তা ভেঙ্গে গেলে আপনার শারীরিক জটিলতা বেড়ে যাবার সম্ভাবনা খুবই প্রবল। যেমন আপনার যদি উচ্চ রক্তচাপ বা সুগারের সমস্যা থাকে, তবে সেক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাড়তে পারে শ্বাস কষ্টের মত সমস্যাও। সংক্রমিত হবার পর তাই আপনাকে ধৈর্য্য ধরতে হবে। আমি মনে করি মনোবল ঠিক থাকলে ঘরে বসে চিকিৎসার মাধ্যমে ৮০ শতাশং মানুষের পক্ষে সুস্থ হওয়া সম্ভব।

এ কথা অনস্বীকার্য বিশ্বব্যাপি জনমনে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে তাতে আক্রান্ত যে কোন মানুষের পক্ষে মনোবল হারানোই স্বাভাবিক। কিন্তু, বেশ কয়েকদিন আমি এই করোনার সাথে লড়াই করার পর উপলব্ধি করতে পেরেছি অনেক রোগের মহাওষৌধ হলো এই মনোবল। আমি ব্যক্তি জীবনে বড় কোন সমস্যা মোকাবেলায় টেষ্ট ক্রিকেটের একটি থিওরি ফলো করি। আর তা হলো সেশন টু সেশন মোকাবেলা করে যাওয়া। এতে সমস্যার দীর্ঘ মেয়াদী চাপটা অনেকটাই কমে আসে। টেষ্ট ক্রিকেটে যখন দল চাপে থাকে তখন এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে দেখা যায়। পাঁচদিন পরে কি হবে তা নিয়ে চিন্তা নয়। সারাদিনে আমি কি করবো, কি খাব সেই বিষয়ে ভাবতাম। অহেতুক চিন্তা করে নিজের উপর চাপ সৃষ্টি করতাম না। কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়ার পর অনেকেই এই রোগ থেকে মুক্তির উপায় জানতে চেয়েছেন। সবাইকে আমি-নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছি।

অন্যসব রোগের মত করোনা থেকে মুক্তি পেতে আমাকেও ঔষধ খেতে হয়েছে। পাশাপাশি আমি প্রাধান্য দিই প্রাকৃতিক কিছু উপাদানের উপর। আমার লেখায় প্রাকৃতিক উপাদানগুলো সম্পর্কে বর্ণনা থাকলেও ঔষধ সম্পর্কে কোন বর্ণনাই আমি দেব না। কারণ চিকিৎসকরা আমার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে কিছু ঔষধ আমাকে দিয়েছিলেন। আমি মনে করি আমার সমস্যার সাথে অনেকের শারীরিক সমস্যা মিলবে না। কিন্তু এখানে উলে­খ করলে হয়ত অনেকে চিকিৎসকের সাথে কথা না বলেই এসব গ্রহণ করে ফেলবেন। তাই সঙ্গতকারণেই আমি এখানে ঔষধের নাম উলে­খ করছি না।

প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে আমি সবচাইতে বেশি ব্যবহার করেছি মধু (সাধারণ ও কালো জিরা মিশ্রিত মধু), আদা, লং, রসুন, কালো জিরা, মসলা। মধু, আমি গরম পানি আর লেবুর রস মিশিয়ে সকাল-বিকাল পাঁচ/ছয়বার খেতাম। একবার কালো জিরার মধু খেলে আরেকবার গরম পানিতে শুধু মধু দিয়ে খেতাম। আদার ব্যবহার আমি দুই ভাবে করেছি। আদা কুচি কুচি করে কেটে লবন দিয়ে চিবিয়ে এর রস খেয়েছি দিনে তিন থেকে চারবার। এছাড়া লিকার চায়ে আদা দিয়ে দিনে দুবার খাওয়া হতো। এছাড়া লং আমি দু’ভাবে ব্যবহার করতাম। গরম পানিতে ভাব নেয়ার সময় কালোজিরার সাথে ও কাশি এড়াতে মুখে সব সময় কয়েকটি লং রাখতাম। আমি জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার নবম দিনের মাথায় গরম পানির ভাপ নিতে গেলে কফ খুব দ্রুত বের হয়ে আসে। ফলে শ্বাসকষ্ট অনেকটা বেড়ে যায়। এর ফলে আমি দু’দিন ভাপ নেয়া বন্ধ রাখি। তাই এই ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে নিজের অবস্থা বুঝে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শ্বাসকষ্ট দূর করতে আমি দুভাবে রসুন ব্যবহার করতাম। প্রতিদিন ঘুমাতে যাবার আগে তিনটি বড় আকারের রসুন ১৫ মিনিটি পোড়ানোর পর ঠান্ডা হলে খোসা ছাড়িয়ে খেয়ে নিতাম। এয়াড়া, রসুন সরিষার তেলে দিয়ে একটি পাত্রে বা চামচে নিয়ে চুলায় গরম করে তেল বুকে মালিশ করতাম। এই পদ্ধতি বেশ কাজ দিতো আমার। 

কোভিড আক্রান্তদের কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়মিত গণনা করতে হবে। গণনার পদ্ধতি হলো আপনি প্রতি মিনিটে কতটি শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন। সুস্থ অবস্থায় একজন মানুষ ১৫/১৬টি শ্বাস নেন। কেউ যদি মিনিটে ২৫টির উপরে নেন তবে বুঝতে হবে তার শ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় চিকিৎসকদের সাথে কথা বলা উচিত। এছাড়া ঘরে বসে আরো একটি পদ্ধতি রয়েছে রক্তে অক্সিজেনের পরিমান নির্ণয়ের।

অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছেন এসময় কি খাওয়া যায়। আমার পারামর্শ আপনি সাধারণ অবস্থায় যা খান তা এই অবস্থায়ও খেতে পারবেন। এড়িয়ে চলতে হবে ঠান্ডা জাতীয় খাবার। তবে এ কথা সত্য যখন শরীরে জ্বর বেড়ে যায় তখন খাবারের রুচি কমে যায়। প্রথম সপ্তাহে আমি মোটামুটি সব খেতে পারতাম। দ্বিতীয় সপ্তাহে বিষয়টি একটু কঠিন ঠেকে। একটা সময় ভাত খেলে বমি করে ফেলতাম। তার উপরে মুখে রুচি আর নাকে ঘ্রাণ শক্তি ছিল না। তাই এক সময় তরল খাবার খেতে শুরু করি। বিশেষ করে গরুর দুধ, হরলিক্স আর বিক্সিট মিশিয়ে দিনে কয়েক দফা খাই। সাথে বেশ কিছু ফল খেতাম। মূলত লক্ষ্য ছিল কোনভাবেই পেট যেন খালি না থাকে। এভাবে আমার প্রায় পাঁচদিন চলে। এই সময় বেশি পরিমানে ফল খাই বিশেষ করে যেগুলোতে ভিটামিন সি আছে।

শারীরিক ফিটনেস ধরে রাখার জন্য খাবার গ্রহণের পাশাপাশি কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর জন্য গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো নিয়মিত ব্যায়াম করা। প্রতিদিন ঘরেই বিশ মিনিট ব্যায়াম করলে শরীর অনেক বেশি সতেজ থাকার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, শরীর চর্চার পাশাপাশি ফুসফুসের ব্যায়াম এসময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি এসময় প্রাণায়ন করতাম নিয়মিত। ইউটিউবে প্রাণায়নসহ ফুসফুসের বেশ কিছু ব্যায়াম আছে। করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য খুবই সহায়ক এগুলো। এর পাশাপাশি শ্বাসকষ্টের সময় একজন রোগী কিভাবে ঘুমাবেন সে সংক্রান্ত বেশ কিছু ভিডিও ইউটিউবে পাওয়া যায়।

যারা বাসায় একা চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের সতর্কতার সাথে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই নিকটবর্তী কোভিড হাসপাতালের খোঁজ রাখতে হবে। অবস্থা যদি বেশি খারাপের দিকে যায় তবে তিনি যেন কোভিড হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন। এর  সাথে অ্যামম্বুলেন্সসহ প্রয়োজনীয় সব ফোন নাম্বার হাতের কাছে রাখবেন। এসময় কাছের কিছু মানুষকে নিজের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে রাখা ভালো। যাতে যে কোন সমস্যায় তারা এগিয়ে আসতে পারেন। তবে, বেশি মানুষজনকে নিজের অবস্থা না জানানোই ভালো। কারণ বারেবারে তারা যোগাযোগ করলে আপনার উপর এক ধরণের মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। মোটকথা চাপ সৃষ্টি হয় এমন কিছুই করা যাবে না। আমি এসময় কোভিড সংক্রান্ত সকল খবর দেখা শোনা থেকে নিজেকে বিরত রাখতাম। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রয়োজন না হলে ব্যবহার করতাম না। সুযোগ পেলে এই সময় গান শুনে আর মুভি দেখে সময় কাটিয়ে দিতাম।

দেশে যে হারে করোনা আক্রান্ত রোগী বাড়ছে তাতে কোভিড হাসপাতালগুলোতে সিট খালি নেই। চিকিৎসকরাও বলছেন সকলের হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি সেই পথ অনুসরণ করেই সুস্থ হই। আমি মনে করি নিয়মগুলো মেনে ঘরে বসেই কোভিড রোগী নিজের প্রতি সঠিক যত্ন নিতে পারলে হাসপাতালের উপরও অযাচিত চাপ কমবে। আর হাসপাতালগুলো মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারবে ।

প্রবীর বড়ুয়া চৌধুরী, সহকারি বার্তা সম্পাদক,  বৈশাখী টেলিভিশন ।

এই বিভাগের আরো খবর

করোনা পরীক্ষায় পদে পদে ভোগান্তি 

আশিক মাহমুদ: করোনার পরীক্ষা করাতে পদে...

বিস্তারিত
কুষ্টিয়ায় হরিজন সম্প্রদায়ের জমি দখল! 

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা: কুষ্টিয়ায় হরিজন...

বিস্তারিত
বিশ্বনেতৃত্বে আমেরিকার আসন নড়বড়ে!

ফারহীন ইসলাম টুম্পাঃ করোনাভাইরাস...

বিস্তারিত
সুরের ভুবনের একটি নক্ষত্রের বিদায়

বিউটি সমাদ্দার: এন্ড্রু কিশোরের...

বিস্তারিত
লাফিয়ে বাড়ছে কাঁচামরিচের দাম

সুমন তানভীর: রাজধানীর বাজারে লাফিয়ে...

বিস্তারিত
দুর্দিনে পত্রিকার হকাররা, ফিরছেন গ্রামে

পার্থ রহমান: করোনার দুর্যোগকালে...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *