৬ মাসে সাগরপথে ৭,৮৯৯ বাংলাদেশির ইউরোপে প্রবেশ আপডেট: ০৫:৩৯, ২৯ জুলাই ২০১৭

কূটনৈতিক প্রতিবেদক: এ বছর সাগরপথে অবৈধভাবে যতো লোক ইউরোপে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ সেই তালিকার অন্যতম। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের কাজ করা সংগঠন ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত শুধু ভূমধ্যসাগর পথ পাড়ি দিয়ে (সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট) দিয়েই সাত হাজার ৮৯৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছে।

আজ শনিবার  রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত এক পরামর্শ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আগামীকাল রোববার (৩০ জুলাই) আন্তর্জাতিক মানব পাচার বিরোধী দিবস উপলক্ষে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এ সভার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক।

ব্র্যাকের স্ট্র্যাটেজি, কমিউনিকেশনস অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট কর্মসূচির ঊর্ধ্বতন পরিচালক আসিফ সালেহ্’র সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং রামরুর সমন্বয়ক সি আর আবরার, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক  কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ, সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃ শাহ আলমসহ আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম হাসান। নানা বিশ্লেষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ইউরোপে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ঠিক কতো সংখ্যক বাংলাদেশি আছেন তার কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে গত এপ্রিলে ঢাকা সফরকালে ইইউ প্রতিনিধি দল ইউরোপে ৮০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশির উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮-২০১৫ সাল পর্যন্ত আট বছরে ৯৩ হাজার ৪৩৫ জন বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। এই বছরের ছয় মাস ধরলে এই সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে।
অনুষ্ঠানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, এটা সত্যি যে ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধে আমাদের চমৎকার আইন হয়েছে। একই সময়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনও হয়েছে। কিন্তু এসব আইনের বাস্তব প্রয়োগ আমরা কতটা করতে পেরেছি তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

তিনি বলেন, পুলিশের তথ্য আনুযায়ী, মানবপাচারের সাড়ে ৩ হাজার মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ জনের যাবজ্জীবন শাস্তি হয়েছে। এটা সেরকম বড় শাস্তি হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ার নানা দুর্বলতা চিহ্নিত করে তিনি বলেন, অনেক সময় পুলিশ প্রতিবেদন সঠিকভাবে আসে না। সে ক্ষেত্রে আদালতের কিছুই করার থাকে না।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ঘটনা যেভাবেই ঘটুক না কেন মনে রাখতে হবে মানবাধিকার রক্ষা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। এখানে রাষ্ট্রকেই মূল দায়িত্ব নিতে হবে। আর ছোট অপরাধীদের পরিবর্তে প্রয়োজনে ২৫ জনের একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা করে গড ফাদারদের তালিকা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।   

সি আর আবরার বলেন, মনে রাখতে হবে মানব পাচারে দেশে-বিদেশে বড় বড় স্বার্থগোষ্ঠী অনেক ক্ষমতাধর। এজন্য আমাদের টার্গেট করে মূল হোতাদের খুঁজে বের করা উচিত এবং তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।  

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ বলেন, অভিবাসন খরচ কমিয়ে আনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ অতিরিক্ত টাকা খরচ করে কেউ গেলে সেই টাকা তুলতে গিয়ে অনিয়মত হয়ে যান। পাশাপাশি তিনি মানব পাচার রোধে স্বারষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বিমানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাজের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।  

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শাহ আলম বলেন, মানবপাচার একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। কাজেই মূল হোতাদের চিহ্নিত করা জরুরি।
আসিফ সালেহ সভার সুপারিশসমূহ তুলে ধরে বলেন, মানব পাচার রোধে আমাদের মূলত চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এগুলো হচ্ছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা আনয়ন, সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা, মামলা হলে সেটার সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সমূহের সমন্বয় সাধন।

অনুষ্ঠানে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ প্রধান কে এম আলী রেজা, উন্নয়ন কর্মী আসিফ মুনীর, পুলিশের মানবপাচারের সেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুরা বেগম, র‌্যাবের উপ পরিচালক আবদুল্লাহ আল মারুফসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জুলাই মাসের শুরুতে তুরস্ক জানিয়েছে, অবৈধ পথে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টায় তুরস্কে গিয়ে প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি আটকা পড়েছেন। ইউরোপের এই চিত্রের পাশাপাশি সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড যাওয়া এবং সেখানকার গণকবরের কথা চিন্তা করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। মালয়েশিয়াও সম্প্রতি অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। অভিযানের প্রস্তুতি চলছে সৌদি আরবেও।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে প্রায় চার লাখ বাংলাদেশি বৈধ কাগজপত্র না থাকায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এ বছর মানব পাচার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনমন ঘটেছে। এই প্রতিবেদনে দেশগুলোকে তিনটি স্তর বা টায়ারে ভাগ করা হয়। গত পাঁচ বছর বাংলাদেশকে রাখা হয়েছিল দ্বিতীয় স্তরে (টায়ার-টু)। এবার এক ধাপ নামিয়ে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় স্তরের ‘নজরদারিতে থাকা দেশের তালিকায় (টায়ার-টু ওয়াচ লিস্ট)’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও হংকংসহ ৪৫টি দেশ। বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশের দিকে যাচ্ছে এবং নিরাপদ অভিবাসন প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে, তখন এই চিত্র  উদ্বেগজনক।

বক্তারা আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু সংস্থার তথ্য তুলে ধরে বলেন, গত চার বছরে প্রায় দেড় লাখ লোক বঙ্গোপসাগর দিয়ে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত দেড় হাজার মানুষ সাগরেই মারা গেছেন। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দুই শতাধিক মরদেহ, যার মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশি।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে মানবপচার দমন ও প্রতিরোধ আইন হওয়ার পর গত পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মামলা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব মামলার অধিকাংশরই এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি। 

 

Publisher : .