গণমাধ্যমের সমালোচনার প্রতিবাদ করতেন না মুজিব আপডেট: ০৬:৩৩, ১২ আগস্ট ২০১৭

নিজস্ব প্রতিবেদক: একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলায় গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় খবরের উৎসই ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। এসময় সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিকদের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরল নজির সৃষ্টি হয়েছিল।

যেই সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি স্বাধীন দেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, পেশাদারি গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের উন্নয়নের চিন্তা ও পরিকল্পনা করতেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম নিয়ে তাঁর স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে।

তিনি স্বাধীন বাঙালি জাতির জনক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বঙ্গবন্ধু, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। এই রাজনীতিবিদ ও বিশ্বমানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তার তারুণ্যে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় তৎকালীন স্বনামখ্যাত আজাদ পত্রিকায় শুধু সাংবাদিক হিসেবেই নয়, নিজেকে উজাড় করেছিলেন সংবাদপত্রটির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের জন্য।  

দৈনিক জনকন্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান জানান,“তখন তাদের যে রাজনীতি ছিল, তারা যে ভাবে আন্দোলন করতেন, সেক্ষেত্রে এগুলো করা দরকার।”  

স্বভাবতই সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর ধারনা ও জ্ঞান ছিল স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। সহজাতভাবেই তিনি নেতা হয়েও মিশে যেতে পারতেন সাংবাদিকদের সাথে, আপন করে নিতেন তাদেরকে।

দ্য এশিয়ান এইজের সহযোগী সম্পাদক সৈয়দ বদরুল আহসান জানান, “যেগুলো জুনিয়র সাংবাদিক ছিল ওরাও সবসময় তাকে মুজিব ভাই বলতেন, জিজ্ঞেস করতেন কোন পত্রিকায় আছো ,নাম কি, কবে যোগদান করেছ, বাবার নাম কি?”

তোয়াব খান আরও জানায়,“অনেক সাংবাদিকের নাম আমি বলতে পারি, যারা ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে যথেষ্ট সহায়তা পেয়েছেন ,তার বাড়িঘর থেকে শুরু করে সংসার চালানোর ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু সাহায্য করতেন।”

লেখক ও সাংবাদিক হারুন হাবিব জানান, “বঙ্গবন্ধুর  সফরসঙ্গী হিসেবে যেসব সাংবাদিকরা যেতেন, তারা খেয়েছে কিনা, আগে তার খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হয়ে তারপর বঙ্গবন্ধু খেয়েছেন।”

নেতা, মন্ত্রী, এমপি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি যেই হোন- তারা গণমাধ্যমে সাংবাদিকদের সমালোচনার মুখে পড়েন। অনেকে এগুলোকে সহজভাবে সহনশীলতার সাথে নিতে পারেননা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন ব্যতিক্রম।

তোয়াব খান আরও জানান, “অধিকঅংশ রির্পোট তার বিরুদ্ধে গিয়েছে কিন্তুু কেউ বৈরি আচরণ বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছে, এটা কেউ বলতে পারবে না। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রিপোর্ট হলেও-তিনি প্রতিবাদ করতেন না।’’

সৈয়দ বদরুল আহসান আরও জানান, “এস.জি. এম বদরুউদ্দীন। তিনি দিনের পর দিন ৬ দফার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে লিখে গেছেন। ৮৫ সালের দিকে করাচিতে এক সিনিয়র সাংবাদিক গেছেন। তখন তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ,এত বড় মাপের একজন নেতা, আমি তাকে বুঝতে পারি না, তার  বিরুদ্ধে আমি লিখেছি, কিন্তু এই মানুষটা আমাকে কীভাবে ব্যবস্থা করে আমাকে এখানে পাঠালো। কিন্তু তোমরা তাকে মেরে ফেললা কেন? আমাদের যে সাংবাদিকরা ছিলেন তারা বললেন যে, এই প্রশ্নের আমরা কোন উত্তর দিতে পারবো না, আমাদের লজ্জায় মাথা হেট হয়ে গেলো ।”

বিশাল হৃদয়ের বঙ্গবন্ধুর সাথে সাংবাদিকরা কখনো দূরত্ব অনূভব করতেন না। বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবরের প্রধান উৎসই ছিলেন শেখ মুজিব। যেই সুবিধা শুধু দেশের নন বিদেশি সাংবাদিকরাও পেয়েছেন।

লেখক ও সাংবাদিক হারুন হাবিব জানান,“আমার মনে হয়না যে বাংলাদেশের এমন কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি কিংবা নেতা নেই, যে সংবাদ ও সাংবাদিকদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছেন ।”

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে মর্যাদাশীল গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্ন, উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা ছিল, সেসব ক্ষতিগ্রস্ত হয় নানাভাবে তাকে হত্যার পর।

তোয়াব খান আরও জানান, “সাংবাদিকদের জন্য চাকরি বিধি আইন সেটা প্রথম হয়। তারপরে তো ওয়েজ বোর্ড করেছেন।”

লেখক ও সাংবাদিক হারুন হাবিব জানান, “বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংবাদপত্র জগতের একটা মুক্ত আবহ, যেটা তৈরি হয়েছিল, সেটা একটা বদ্ধ অবস্থায় আসে।”

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার জগতে পেশাগত ক্ষতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত নানান সংকটেরও যাত্রা শুরু হয় বলে জানান বিশ্লেষকরা।

 

Publisher : .