গণমাধ্যমের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম  আপডেট: ০২:০৩, ২৩ আগস্ট ২০১৭

।। অশোক চৌধুরী ।।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশের কারণে সামাজিক মাধ্যমগুলো এখন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা বিশ্বব্যাপী দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিনই সেখানে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবহারকারী। বাংলাদেশেও একই চিত্র। এখানেও খুবই শক্তিশালী একটি প্রভাব তৈরি করেছে ফেসবুক। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, দেশের মূলধারার গণমাধ্যমের ওপরও ফেসবুক ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করছে। পেশাদার সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কোনো খবর এড়িয়ে গেলেও, ফেসবুকে কারো না কারো ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশ হয়ে যায়, উঠে আসে আলোচনায়। ফলে শুধু যে গণমাধ্যমের অনেক খবরের উৎস হয়ে উঠেছে ফেসবুক তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে পত্রিকা ও টেলিভিশনের ওপর চাপও সৃষ্টি করে। যাতে খবরটি গুরুত্বের সাথে প্রকাশ ও প্রচার করতে বাধ্য হয়। 

গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার যে ভিডিও ফুটেজ থেকে মানুষ নৃশংস ঘটনাটির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কিছু বিবরণ পায়, তা পাশের এক ভবন থেকে একজন কোরীয় নাগরিকের তোলা। ফেসবুকে প্রথম তা প্রকাশ বা প্রচার হয় এবং মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে বা ভাইরাল হয়ে যায়। হলি আর্টিজানের ঘটনার তদন্তকারীরা ভিডিও চিত্র থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান, যা তদন্তকে সহায়তা করেছে। সহায়তা করেছে বর্বর, নরঘাতক জঙ্গিদের নির্মূল অভিযানকে। গণমাধ্যমও ফুটেজটি ব্যবহার করছে অনায়াসে। আর এর মাধ্যমে ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে দর্শকদের ভালমতোই ধারণা দিতে পারছে। গণমাধ্যমের কাছে এটা বড় এক দলিলের মতো।

গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যাবে, সাম্প্রতিক সাড়া জাগানো খবরগুলো সবার আগে সর্বসাধারণের গোচরে এনেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম নয়। খোদ রাজধানীর বুকে দিনে-দুপুরে কুপিয়ে ভয়াবহ নৃশংসতায় বিশ্বজিত হত্যা, বইমেলা থেকে ফেরার পথে লেখক, ব্লগার অভিজিত রায়কে হত্যা, সিলেটে বর্বর কায়দায় শিশু রাজনকে হত্যা, কলেজছাত্রী খাদিজাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা, চট্টগ্রামে পুলিশ সুপার বাবুল আকতারের স্ত্রীকে হত্যা, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে পৌর মেয়র মীরুর গুলিতে সাংবাদিক শিমুল হত্যা-- এরকম আরো অনেক আলোচিত ঘটনার উদাহারণ খুঁজে পাওয়া যাবে, যেগুলো প্রথম সাধারণের গোচরে এসেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে।

অনেকের মনে থাকতে পারে, সিলেটের কিশোর রাজন হত্যাকাণ্ড নিয়ে সবার আগে সোচ্চার হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা। তাদের জনমত, প্রচারণা প্রভাবিত ও বাধ্য করে গণমাধ্যমকে বিষয়টি ইস্যু করতে। এর পরই পুলিশ তৎপর  হয় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে কার্যকর অভিযান পরিচালনায়। এই মর্মন্তুদ হত্যাকাণ্ডের প্রধান হোতা সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়েছিলো। সেখানেও প্রবাসী বাংলাদেশীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযুক্ত সম্পর্কে জানতে পেরে তাকে সনাক্ত করেছিল, সেইসাথে তারাই তাকে ধরিয়ে দেয়। অপরদিকে নির্যাতনকারীরাও ঘটনাটি ভিডিও করেছিল ফেসবুকে দেয়ার জন্য, তাদের স্বার্থ প্রচারের জন্য। পুরো ঘটনাটি দেশ জুড়ে আলোড়ন তোলে। এর পর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার পেছনে নিঃসন্দেহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অগ্রগণ্য ভুমিকা ছিলো।

কেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তা সহজেই বোধগম্য। আজকাল প্রায় সবার হাতে আছে স্মার্ট মোবাইল ফোন। মুঠোবন্দী ছোট্ট এই যন্ত্রটার ক্যামেরা বা ভিডিও অপশনে গিয়ে সামনে ঘটতে থাকা যেকোনো ঘটনার স্থির বা চলমান চিত্রধারণ করে ফেলা সহজ। প্রায় সকলে সেটাই করছে, কবে কোন্‌ সাংবাদিক আসবে ঘটনার খবর জানতে, সে-আশায় বসে থাকছে না। ঘটনার ছবি বা ভিডিও এবং জানা তথ্য ফেসবুক টাইমলাইনে গরম গরম তুলেও দিচ্ছে, সাংবাদিকদের জন্য আর অপেক্ষা করছে না। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টিভি ও বেতারের বেতনভোগী প্রতিবেদক- আলোকচিত্রীদের চেয়ে এই স্বতঃস্ফূর্ত সংবাদদাতারা অনেক বেশি দ্রুততার সঙ্গে কাজ করেন। এর কারণও সহজবোধ্য। গণমাধ্যমের নিজস্ব সাংবাদিকদের প্রতিদিন কিছু নির্দিষ্ট অ্যাসাইনমেন্ট থাকে, অর্থাৎ পূর্বনির্ধারিত কোনো ঘটনা বা অনুষ্ঠান কভার করার দায়িত্ব পান। সেগুলো নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি  করা ছাড়াও অনির্ধারিত বা আকস্মিক ঘটনা কভার করার জন্যে অল্পসংখ্যক প্রতিবেদক বা ক্যামেরাপার্সন কাজ করেন, যাদের পক্ষে কোনো এলাকা জুড়ে বা দেশব্যাপী সংঘটিত অগুণতি ঘটনা-দুর্ঘটনাস্থলে একই সঙ্গে দ্রুত যাওয়া অসম্ভব। অনেক বড় নেটওয়ার্কের পত্রিকা বা টেলিভিশনের পক্ষেও সব ঘটনা মুহূর্তে কভার করা সম্ভব নয়।

এই সীমাবদ্ধতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেই। দেশের বা শহরের যেখানে যা-ই ঘটুক, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তি সেখান থেকেই মুহূর্তের মধ্যে ছবি ও প্রাথমিক তথ্য তাঁর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রচার করে দিতে পারছেন, শুধু দরকার তাঁর সদিচ্ছা আর সামান্য উদ্যোগ। এক্ষেত্রে উদ্যমের অভাব দেখা যায় না, বরং একটা ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটতে না ঘটতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার খবর এসে যাচ্ছে। পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম বিষয়টিতে প্রবেশ করার আগেই তা নিয়ে সাধারণের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাঠক-দর্শকদের বাড়তি প্রাপ্তি বা মজা হল-- একটা খবর বা ভিডিও গোচরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। পছন্দ-অপছন্দের কথা জানাতে পারে, নিজস্ব মন্তব্য, অভিমত তাৎক্ষণিকআবে প্রকাশ করতে পারে। তারাও নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী সেগুলো আরো প্রচার করার সুযোগ রাখে বা সেগুলো অপছন্দ হলে ঝেড়ে ফেলতে পারে নিজস্ব গণ্ডি থেকে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহুলপ্রচারিত খবর বা ছবি ও ভিডিও চিত্রকে তথ্য  প্রযুক্তি জগতের পরিভাষায় ভাইর‌্যাল হওয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ কোনো ভাইরাসের জীবাণু যেভাবে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে, তার সাথেই এই প্রবণতার তুলনা করা হয়। এখনকার জনপ্রিয় বা অ-জনপ্রিয়, বহুল বা স্বল্পপ্রচারিত-প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যম এসব ভাইর‌্যাল খবর খোঁজে নিজেদের পত্রিকা বা টেলিভিশনে প্রকাশ ও সম্প্রচারের জন্য। অনেক বড় পত্রিকাতেও এসব খবরের জন্যে প্রতিদিন বেশ বড় স্পেস বা জায়গা বরাদ্দ করা হয়। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এর ব্যবহারকারীরা প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত অসংখ্য খবর, ভিডিও ও স্থির চিত্র শেয়ার করে প্রচার করছ, যা আরও অনেকের নজরে আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। সব পত্রিকা, টিভি ও বেতার চ্যানেল নিজেদের উদ্যোগেই নিজস্ব ফেসবুক পেজ খুলছে, টুইটারে টুইট করছে, যেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাঠক-দর্শক-শ্রোতা বাড়াতে পারে এবং তাদের সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।

তবে, নানা ইতিবাচক দিকের মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে অনেক নেতিবাচক, ক্ষতিকর অভিজ্ঞতাও কম নয়। গুজব-অপপ্রচারের মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি, সরকারবিরোধী প্রচারণা, জঙ্গিবাদের প্রচার-- এমন নানা বিষয় নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে।

মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর নানা দিক থেকে নানা ধরণের চাপ থাকে, যে-কারণে তারা চাইলেও অনেক সময় অনেক ঘটনা প্রকাশ ও প্রচার করতে পারে না। নীতির ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু ফেসবুকের ক্ষেত্রে তা নেই। যদিও ফেসবুকে কোনো বক্তব্য বা ছবি, ভিডিও চিত্র প্রকাশ ও প্রচারের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকে মামলার মুখে পড়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে, জেল খেটেছে, বিচারের সম্মুখীন হচ্ছে। সেগুলোকে একপাশে রাখলে বলা যায়-- ফেসবুক এখন খবর প্রচার ও প্রকাশের জনপ্রিয়তম মাধ্যম। প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের বিপরীতে ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যবহারকারীদের বড় সুবিধা হলো, তাদের তেমন কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় না। বরং তাদের ব্যবহারের ব্যাপকতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর আয়বৃদ্ধির বড় পুঁজি হিসেবে ভূমিকা রাখে, বিজ্ঞাপন পায়, বিজ্ঞাপন বাড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাইটগুলোতে। ফলে স্বল্পমূল্যে বিজ্ঞাপনেই খুশি থাকে সাইটগুলো। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আজকাল এসব সুবিধা নিচ্ছে। তারা নামমাত্র মূল্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের সেবা বা পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারছে, যেগুলো ছাপানো বা প্রচার করার জন্যে আগে গণমাধ্যমে মোটা অংকের টাকা গুণতে হতো।

যে কারণে এতসব আলোচনার অবতারণা, তা হলো-- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তাহলে কি মূলধারার গণমাধ্যমের সমান্তরাল কিংবা বিকল্প হয়ে উঠছে বা উঠেছে এরই মধ্যে? গভীর ভাবে যাঁরা বিষয়টি পর্যক্ষেণ করছেন তাদের অনেকের মতে, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কাঠামোটা যে বিকল্প ধারার, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তিশালী প্রভাবের আরেকটি বড় উদাহারণ হলো-- দেশে জঙ্গি উগ্রবাদীদের হাতে একের পর এক ব্লগার, লেখকদের হত্যার ঘটনাগুলো। সেখানে তারা যা লেখেন, সেগুলোকে উগ্রবাদী  জঙ্গি সন্ত্রাসিরা বেশি ভয় পায়, ফলে তাদের লেখায় আতংকিত হয়ে জঙ্গিরা ব্লগার-লেখকদের হত্যা করে স্তব্ধ করতে চাইছে। গত কয়েক বছরে যেভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর ধর্মীয় উগ্রবাদীদের একের পর এক আক্রমণ এসেছে, গণমাধ্যম সে-তুলনায় অনেক নিরাপদ জায়গায় আছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে— এটা এখন অনিবার্য সত্য। তাই বলে দেশের প্রতিষ্ঠিত মূলধারার গনমাধ্যম সংবাদপত্র, টেলিভিশন, বেতার ইত্যাদিতে রাতারাতি ধস নামবে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ, গণমাধ্যমের পেছনে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, যার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির নতুন নতুন শক্তি, যেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের সীমাবদ্ধতার বড় জায়গা। তবে খবর বা সংবাদ যে-মাধ্যমেই প্রকাশিত-প্রচারিত হোক, মানসম্পন্ন ভালো সংবাদের ও সাংবাদিকতার চাহিদা বরাবরই থাকবে। তথ্য মহাবিপ্লবের এই যুগে সংবাদ যে-মাধ্যমেই আসুক, পাঠক-দর্শক সুলিখিত ও দক্ষতার সাথে উপস্থাপিত সংবাদগুলো বেছে নিতে ভুল করবেন না কখনোই, এবং হয়তো সেটাই হবে পেশাদার সাংবাদিকতার টিকে থাকার সবচে বড় ভরসার জায়গা।

 লেখক: বার্তা প্রধান, বৈশাখী টেলিভিশন