মদন তাঁতি অথবা এক ক্রুসেডারের যুক্তি তক্কো আর গপ্পো আপডেট: ১০:৪৬, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

>< তমাল রায় >

৬ফেব্রুয়ারি,১৯৭৬:
আজ একটু আগেই তিনি ছাড়া পেয়েছেন পিজি হাসপাতাল থেকে। মৃণাল এসেছিল তার গাড়ি নিয়ে। তোবড়ানো গালে আপাতত কোনো দাড়ি গোঁফের জঙ্গল নেই। লাইব্রেরি ফ্রেমের চশমার নীচে চোখ হাসছে। গাড়ি ভবানীপুর ধরে এগোতে যাবার আগেই বললেন - মৃণাল গাড়িটা ঘোরাও। চোখ চলমান গাড়ীর বাইরের দিকে ,কিন্তু কঠিন। অগত্যা...আপাতত রেসকোর্সের সামনে দুধ সাদা এম্ব্যাসাডরটা দাঁড়িয়ে। শেষ বিকেলের আলোর খেলা চলছে আকাশ জুড়ে। বেগুনির সাথে কমলা,কমলার ফাঁকে কিছুটা আকাশী,আর মাঝে কিছু মেজেন্টা,আর ব্রিক রেডের খেলা। ঘোঁড়াগুলো দৌড় শেষে আপাতত ঘাস চিবোচ্ছে শান্ত হয়ে,পাখিরা দল বেঁধে বাসায় ফেরার আগে একবার উড়ে নিচ্ছে...
:মৃণাল,মনে পড়ছে ডি লা মেয়ারের লিসনার্স কবিতাটা? ইজ দেয়ার এনিবাডি দেয়ার...আর,টারেট থেকে পাখিগুলো ঘোঁড়ার খুড়ের শব্দে,উড়ে যাচ্ছে। তুমি কি ফ্রেমটা লক্ষ্য করেছ? 
পায়ে তেমন জোর নেই,উঁচু নীচু ঘাস। পড়ে যাচ্ছিলেন। মৃণাল হ্যাঁ বলে হাতটা ধরতে গেল। 
: না না। আমি ঠিক আছি। তুমি জানো এই বাংলায় আমার থেকে স্বস্বাবলম্বী কেউ নয়। লোক আমায় উপহাস করতে পারে,কিন্তু আমি কৃতদাস নই। বিড়ি আছে? একটা দেবে?
মৃণাল খানিক ইতস্তত করে,লম্বা সিগারেট বার করে দেয়… 
: মৃণাল ,তুমিও বুর্জোয়া হয়ে যাচ্ছো। সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান মারতেই কাশি শুরু হল। আর দুটো টান দিয়েই ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। 
বুর্জোয়ার জিনিশ আমার শরীরে রোচেনা মৃণাল। আমি বর্ন প্রলেতারিয়েত। 
গাড়িতে ওঠার সময় শূন্যের দিকে তাকিয়ে ঘুঁষি ছুঁড়ে দিলেন একটা। মুখে অক্ষমতার যন্ত্রণা! গাড়ি চলতে লাগলো ভবানীপুর পেরিয়ে বালিগঞ্জের দিকে…
: সংহিতা ফোন করেছিল।
: কেমন আছে সে বেটি? 
: আজ তো ও আসতে পারেনি। 
: কেন সকলকে আসতে হবে,এর কি মানে। তুমি তো এসেছো। ওর বাপ কি মরে গেছে,একেবারেই,তখন না হয় মালা টালা নিয়ে আসত,আরও অনেকেই আসত। না,তা আসতনা কি বল মৃণাল। আমি তো ফেলনা লোক! বাঙালি বুদ্ধিজীবী হল পাওয়ার সিকার । তার বয়ে গেছে আমার মৃত্যুতে আসতে। তার চেয়ে - ডাই উইদ আ হুইসপার,নট উইদ আ ব্যাং’ই ভালো। কি বল? 
আপাতত শহর কলকাতার সন্ধ্যের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে,তার তাচ্ছিল্য ভরা শব্দরা…গাড়ি দক্ষিণমুখী…

১৫ফেব্রুয়ারী,১৯৭৬

হাজরা মোড়ের ছোট্ট চায়ের দোকানটা আবার জমজমাট। স্যারের সাথে রয়েছেন তার ছাত্রের দল। ওরা ডাকে প্যারাডাইস কাফে। প্যারাডাইসই বটে। স্যার আপাতত বলছেন কম,শুনছেন বেশী। কানাই বলছিলো - স্যার হাওয়া ঘুরছে। তাকিয়ে দেখুন। আঙুল দিয়ে দেওয়াল লিখনকে ইঙ্গিত করল। লাল আর কালোতে লেখা - শহীদ মিনারের নীচে জমায়েতের কথা। -কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া(মার্ক্সবাদী)। স্যারের হঠাৎ খুব কাশি এলো। দমকে দমকে কাশছেন। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে যেন। সঞ্জয় এগিয়ে ধরতে গেছিল। এক ধমক। 
: শোনো বাপু আমি সিমপ্যাথি ড্র করার লোক না। কাশি এলো ওই ওয়ালিং দেখে। হাসিতে ফেটে পড়লেন হঠাৎ,পরেই মুখ কুঁকড়ে গেল যন্ত্রণায়। 
:স্যার পেইন হচ্ছে? 
:হুঁ হচ্ছে। হচ্ছে ওই শুয়োরের বাচ্চাদের কথা ভেবে। এ দেশের কমিউনিস্টরা সব শালা অশিক্ষিতের দল। সব শুয়োরের বাচ্চা। উদাত্ত গলায় বলতে শুরু করলেন-
‘মানুষ তোমাকে ভালোবাসি
এইভাবে,
পৃথিবীর ইতিহাস বারবার 
বদলে গেছে
তবুও মানুষ সবসময় বেঁচেছে।
মানুষ তোমাকে ভালোবাসি’ 
রাত নটার হাজরা মোড়। লোকজন যথেষ্ট। : সঞ্জয় বাংলার বোতল কই? 
: স্যার আপনার প্রাণে বাঁচার কথা নয়, এ অবস্থায়…
থামিয়ে দিলেন ঠোঁটে আঙুল রেখে। চুপ! জ্ঞান দিও না আমায়। আছে কি’না বল? আমার তো তেষ্টা পায়। বাংলা মদ আমার রক্ত। আর আমার শ্বাস প্রশ্বাস বিড়ি। 
ঢোলা পাজামা উঁচু করে পরা। লিক লিকে শরীর। তবু দাপট কমেনি। অমিতাভ বার করে আনলো মদ। আর প্রকাশ্যে গলায় ঢক ঢক করে ঢাললেন। 
:স্যার লোক দেখছে। পুলিশও আছে।
: থাকুক। সিধু বাবুর পুলিশকে গিয়ে বল, আমি ঋত্বিক ঘটক। ঋত্বিক কারো দাসত্ব করে না। এবার বিড়ি দদাও। আমার লাল সূতোর বিড়ি। কে একটা এগিয়ে দিলো। প্রাণ ভরে টানলেন। 
হাঁটতে লাগলো কালিঘাট পেরিয়ে বালিগঞ্জ প্লেসের দিকে। স্যারের পেছন পেছন চলেছে তার অনুগত শিষ্যের দল। আকাশ ভর্তি তারা ফুটেছে। স্যার হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বলতে শুরু করলেন,তোরাও একদিন অনেক বড় হবি দেখিস। জানিস, আমার এফ টি আই আই এর ছাত্ররাও এভাবেই সারাটাক্ষণ আমার সাথে লেগে থাকত। আদুর আজ চিঠি দিয়েছে আমায় জানিস। আদুর গোপালকৃষ্ণন ও একটা ফিল্মের কাজ শুরু করছে। কলকাতা আসবে কথা বলতে। মণি ফোন করেছিল। মণি কাউল। ওরা আমায় ভোলেনি... সঞ্জয় কি একটা কারণে বার্গম্যানের কথা বলতে যাচ্ছিলো। থামিয়ে দিলেন। 
: শোন সঞ্জয়,বার্গম্যান ফার্গম্যান বলতে আসিস না। কেবল ফাঁকিবাজি আর ওপর চালাকি। ‘অযান্ত্রিক’ ও ভেনিসে স্পেশাল এন্ট্রি পেয়েছিলো জুরিজ ক্যাটাগরিতে। আমি ওসব নিয়ে বলিনা। 
চুপ করে আছে সবাই। 
: কই হে,আর একটু রক্ত দাও খাই। 
: স্যার আর না আজ। 
: না,আমার যে খিদে পায়। তেষ্টা পায়। কি করব। দে দে সোনা বাবারা। 
সোনালি তরল গলা দিয়ে নামছে জ্বলতে জ্বলতে… পেটে ব্যথা করে হয়ত। হাত দিলেন। মুখ কুঁচকে গেছে। ব্যথাই তো জীবনকে অন্য দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ করে দেয়। গান ধরলেন,আজ যেমন করে গাইছে আকাশ…

১অক্টোবর,১৯৭৬

কলেজস্ট্রীট থেকে মেডিকেল কলেজের ভেতর দিয়ে সেন্ট্রাল কফিহাউস। আজ চাঁদের হাট। বহুদিন পর আজ সলিল চৌধুরী হাজির। হাজির আই পি টি এ দল ছুট আরও কজন। সুনীল রয়েছে ঋত্বিকের সহকারী। আর কি অদ্ভুত ভাবেই হাজির হেমাঙ্গ বিশ্বাস। আজ গান নিয়ে চলছে আলোচনা। সলিলবাবুই বললেন - ঋত্বিক তুমি কিন্তু রবীন্দ্র সংগীতের অন্তরটা বুঝতে পারো ঠিক। কোথায় এপ্লাই করলে ঠিক মানুষের মন ছোঁবে গান,সেটা সবাই কিন্তু বোঝেনা। 
: সলিলদা আমি মানুষের পাশেই থেকেছি চিরটাকাল। এই বাংলায় আর কোনো বাপের ব্যাটা নেই যে বলবে ঋত্বিক ঘটকের থেকে মানুষকে বেশি চেনে। মানুষের কোথায় সুখ আর কোথায় দুঃখ সেটা জানলেই গানের প্রয়োগ সঠিক হয়। তবে সলিলদা রবীন্দ্র সংগীতের ব্যঞ্জনা আর ভাব বোঝা খুব সহজ নয়। পাশ থেকে আই পি টি এর দল ছুট একজন বলে উঠলো - কিন্তু সেই তো আপনার ছবিতে ওপার বাংলা,এপার বাংলা। রিফিউজি আর কান্না! তা থেকে বেরোতে পারেন না? 
দাঁড়িয়ে উঠেছেন তিনি,আর চীৎকার করছেন,কি ভাবো নিজেদের? দু কলম বিদ্যে নেই পেটে এপার আর ওপার বল! বাংলার আবার এপার ওপার কি। পূব বাংলাও বাংলা এই বাংলাও বাংলা। আমি পার্টিশন মানিনা। ছিন্নমূল মানুষকে নিয়ে রাজনীতির কারবারিদের এই গিনিপিগ বানানোর রাজনীতিকে আমি ঘেন্না করি। 
সলিল বাবু গম্ভীর গলায় বললেন ঋত্বিক বসো । অত উত্তেজিত হওনা প্লিজ। 
: সলিলদা এই নেহরু আর জিন্না আর দে রিয়েলি স্টেটসম্যান? উঁহু! বোথ অফ দেন আর সোয়াইন! ওরা কেবল নিজেদের ধান্দা বুঝতো। আর কিস্যু না! 
সলিল বাবু বললেন হেমাঙ্গ একটা গান ধরুন তো। সেই শঙখচিলটা…
হেমাঙ্গ বিশ্বাস শঙখচিল গাইতে শুরু করলেন। কেমন ঠান্ডা হয়ে এলেন ঋত্বিক। চুপ করে শুনছেন। যেন একটু আগের পাগল করা রাগ তিনি দেখাননি। অন্য কেউ। মাথা নীচু করে কি ভাবছিলেন। হঠাৎ কাঁধে টোকা। বাকি সকলের মুখে হাসি। কখন ঋষিকেশ মুখার্জী হাজির হয়েছেন আড্ডায়। -ঋত্বিক আর দুষ্টুমি করছ না’তো? 
চুপ! পিন পড়লেও শব্দ পাওয়া যাবে। 
: তুমি কিন্তু নতুন জীবন পেলে,আরও কত কাজ বাকি। আবার আসতে হবে বোম্বেতে। না হয় আমার বাড়িতেই থাকবে আবার সমস্যা কি! 
ঋত্বিক এবার হেঁসে ফেলে। ঋষিদা আপনি আমার জন্য অনেক করেছেন। আর কত করবেন? সুরমাতো আজ ও আপনার কথা বলে খোঁটা দেয়। 
পাশ থেকে সুনীল দত্ত,পুরনো ঘাটা খুঁচিয়ে দিলো - 
: দাদা এমন অদ্ভুতই! নইলে শক্তি সামন্তর অফার ফেরায়! বিশ্বজিৎ কতবার স্ক্রিপ্ট দেখতে চেয়েছে,দেখালোই না। মাধবী প্রোডিউসারের জন্য ঘরে ঘরে হত্যে দিয়েছে,উনি কাউকে পাত্তা দেন! এমন কি মেঘে ঢাকা তারার হিন্দিতে করার অফারটাও ফিরিয়ে দিলো। কি বলব বলুন! অথচ বলবেন প্রোডিউসাররা আমায় দেখলে ভয়ে পালায়,আমি ফ্লপ মাষ্টার। 
: এই সুনীল চুপ করবি? নইলে শালা গলা টিপে মারবো। 
: মারুন কাটুন। ভয় কি। আপনিই ভরসা। মারবেন না হয়। তা বলে তো মিথ্যে বলতে পারব না। এমনকি নিজের শরীরটা নিয়েও কেবল ছেলে খেলা। আপনার না হয় ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা নেই,আমরা? 
সুনীলের চোখে জল। ঋত্বিক হাসছেন… 
সুনীল ফের বলা শুরু করল আসলে দাদা স্করপিও। স্করপিওরা এমন হয়। এত প্রতিভাধর,নিজেকে নিয়ে ছেলেখেলা করে। 
: সুনীল আমি কম্যুনিস্ট। কম্যুনিস্টরা প্রতিভাতেও বিশ্বাস করে না,গ্রহ রত্নেও। আমায় এসব গল্প শোনাবি না। পার্টি আমায় তাড়িয়েছে। না তাড়ালে আমিই ছাড়তাম । পার্টি লাইনের সব কথা আমি মেনে নেবো এমন দাসখত আমি লিখে দিইনি। ওয়ান ম্যান কমিশন বসিয়েছিল,প্রমোদ দাশগুপ্ত একাই সে কমিশনের মেম্বার। আবার চেয়ারম্যান ও। এমন কেউ শুনেছো? এতো হিটলারি রাজত্ব। করেছে এক্সপেল । তো কি? আমি কি ভিখিরি নাকি। ফ্যা ফ্যা করে ঘুরবো ওদের পেছনে! কম্যুনিস্ট পার্টি হল সর্বহারার দল। আমি নিজে সর্বহারা। আর আমার থেকে বেশি সর্বহারার কথা কে বলে বল? সুনীল? প্লিজ বল। সলিল বাবু চুপ করে বসে আছেন। কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। হেমাঙ্গ বাবু ঋত্বিকের দিকে তাকিয়ে বললেন,চুপ,ঋত্বিক। বলার অনেক কিছুই থাকে। তা বলে এমন করে পাবলিক ডমেন এ বলতে নেই।

: পার্টি আমায় রাখলো কি না রাখলো,তার জন্য কি আমি কম্যুনিস্ট থাকবো না। আমি গ্রহরত্ন,প্রতিভা এসবে বিশ্বাস করিনা। কেবল বিশ্বাস করি ভাবায়,ভাবো ভাবা প্র্যাকটিশ কর,তাহলেই পথ বেরোবে। হেমাঙ্গদা আপনি বলছেন আমি চুপ করলাম। কিন্তু আপনিই বলুন এই কমিউনিস্ট পার্টির কথা তো আমরা ভাবিনি। 
: কেন জ্যোতি বাবুতো তোমায় পছন্দ করেন ঋত্বিক। তিনিই তো এখন দলের মুখ। হাতের পাঁচ আঙুল কি সমান হয় ঋত্বিক? 
এবার ঋত্বিক হাসছে আর বলছেন
: হেমাঙ্গ দা,আমি ভিখিরি নই। আমার ফিল্ম,আমার যাপন একজন সাচ্চা কমিউনিস্টের। জ্যোতি বসু আমার কাছে স্রেফ একটা নাম। আর কি? আমি লেনিনকে মানি। মার্ক্স এঙ্গেলসে বিশ্বাস রাখি। সেতো দর্শন। ব্যক্তি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেতো ইন্দিরা গান্ধীও আমার সুরমার কাছে মেসেঞ্জার পাঠিয়ে আমার শরীরের খোঁজ নিতেন। তাতে কি হবে? তা বলে আমি বলব,ইন্দিরা ভালো? এশিয়ার মুক্তি সূর্য? বাংলাদেশ স্বাধীনে সর্বত ভাবে সাহায্য করে ফিরে এসে এদেশে জরুরী অবস্থা জারি করল। দাদা বাঁশ ঝাড়ে বাঁশই জন্মায়। এন অটোক্র্যাট রুলার গিভস দ বার্থ অফ অটোক্রেট। সোশালিজম ছিলো নেহরুর মুখোশ। আসলে ধান্দাবাজ অটোক্রাট। আর ইন্দিরাও তাই। আমি দাস ক্যাপিটাল পড়ে থাকতে পারি। দাসানুদাস হব বলে জন্মাইনি। 
আড্ডা শেষে খানিকটা এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি, মদ আর বিড়ি। ফের ক্লান্ত শরীর কে টেনে নিয়ে চল যতদূর সম্ভব। সেভাবেই বাড়ি। বাড়ি মানে তো দুটো ঘর একটা বাথরুম ব্যস। তাও নিজের না,ভাড়া। এই জন্য লক্ষ্মী রাগ করে খুব। বলে, ‘কি হয় এইসব ছাইপাঁশ ফিল্ম বানিয়ে? কি করতে পেরেছো নিজের জন্য? সন্তানের জন্য? একটা আশ্রয় নেবার মত ছাদ। পারোনি,পারোনা। অথচ কত বড় বড় সংলাপ দাও। আরে বাবা জীবনটা সিনেমা নয়!’ 
আপন মনে বিড় বিড় করতে করতে হেঁটে চলেন,যেন সুরমাকে উত্তর করছেন…
নয় তো। সিনেমা আর জীবন এক আমি কবে বলেছি? কিন্তু সিনেমায় আমি জীবনকে আঁকি যতদূর সম্ভব ট্রুথফুল থাকার চেষ্টা করি। আমি ফেলিনির মত ক্ল্যাসিকাল হতে চাইনি হইনি। বার্গম্যানের মত জোচ্চোর হতে চাইনি হইনি। সত্যজিতের মত আপ স্টার্ট ন্যাকা ভদ্দরলোকের ফিল্ম বানানোয় আমার বিশ্বাস নেই। আমি মানুষের মাঝে থেকে মানুষের কথাই বলি। বিশ্বাস করি শিল্প মানুষের জন্য মানুষের প্রয়োজনে। উৎপল দত্ত আমায় ব্যঙ্গ করেছেন। করুন। আমি আইজেনস্টাইনকে গুরু মানি। হ্যাঁ,বিশ্বাস করি আমার শিল্প আমার যুদ্ধ করার খাপ খোলা হাতিয়ার। আমি আমার শিল্পের প্রতি সৎ থাকব। আর হ্যাঁ,ভাবা প্র্যাক্টিশ করব। এ ছাড়া উপায় কি! 
সুনীল এবার তাড়া দেয়,চলুন। এই মনুমেন্টের নীচে আর কতক্ষণ? মশা কামড়ে পা ফুলিয়ে দিল যে। 
: কেন সুনীল জায়গাটা দেখে যাও। অক্টারলোনির মত আমার নামে শহীদ মিনার হলে কেমন হবে সেটা দেখে নেওয়া উচিৎ নয়? আমিও তো শহীদ এই ভদ্দরলোক বুদ্ধিজীবি সমাজে। চল সুনীল। বাট রিমেমবার আমি ঋত্বিক ঘটক। পাওয়ার লোভী ক্রীতদাস নই। 

২১জুন,১৯৭৭ঃ

অভিনন্দন জানানোর পর্ব চলছে। সাত সকালেই বাড়িতে হাজির জনা দশ। তাদের নিয়েই বেরিয়ে পড়া। বাইরে খান্ডব দাহন চলছে। খর জৈষ্ঠের গরম। কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম। গত কয়েকদিন শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আবার কাশির সাথে রক্ত। এদিকে চার জন প্রোডিউসার হাজির হয়েছিল। তিনজন কে না করে দিয়েছিল। কিন্তু রমাকে তো না করা মুশকিল। রমার সাথে তার এক অন্য সম্পর্ক। শান্তিনিকেতনে থাকতেও রমা টাকার জোগান দিয়ে গেছে নিয়মিত। রমার বহুদিনের আবদার তাঁকে নাম ভূমিকায় রেখে একটা ছবি বানাক ঋত্বিক। যেমনটা সুপ্রিয়াকে নিয়ে মেঘে ঢাকা তারা। কিন্তু মুশকিল হল ঋত্বিকতো তেমন ছবি বানায় না। স্টার কাস্টিং এ তার প্রবল আপত্তি,আর এই ‘৭৭ সালে রমাকে লিড রোলে দিয়ে ছবি বানালে তা ঋত্বিকের ছবি হবে না। সুচিত্রা সেন এর ছবি হয়ে যাবে। আধুনিক ছবিতে কনটেন্টই তো নায়ক। তাতে স্টার কি প্রয়োজন! এ কথাটাই এফ টি টি আইতে থাকতে ছাত্রদের বুঝিয়েছে বার বার। রমা সে সব বোঝে কই! অবশ্য টাকা পয়সা দিয়ে যে সাহায্যটা সে করে তার কারণ ঋত্বিক আর রমার এক অন্যরকম বন্ধুতা। সেটা আর কেউ না জানুক ওরা দুজন জানে। সুরমা হয়ত কিছুটা আঁচ করে। কিন্তু তাতে কি! আজ অবশ্য যারা এসেছেন তারা একদমই অন্য কারণে। আজ খুউব আনন্দের দিন। আজ এই প্রথম কমিউনিস্ট সরকার গঠন হতে চলেছে এই দেশে। কত দিনের স্বপ্ন ছিলো। আজকের সম্পর্ক! পার্টি যতই এক্সপেল করুক। ঋত্বিক তো কমিউনিস্টই। সাচ্চা কমিউনিস্ট। মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন জ্যোতি বাবু। তিনি ঋত্বিককে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। প্রমোদ বাবুর সাথে থেকেও জ্যোতি বাবুর কিন্তু ঋত্বিক প্রসঙ্গে ধারণা বদলায়নি। 
: চল এই খুশিতে মদ্যপান হয়ে যাক। 
জগুবাবুর বাজারের সামনে দিয়ে হেঁটে ওরা চলেছে ঢাকুরিয়া লেকের দিকে...দাদা এতটা হাঁটতে পারবেন? 
: দেখ আমি ন্যাকা ন্যাকা পুতু পুতু নই তোমাদের সত্যজিৎ এর মত। হোয়াইট কলারড ম্যান! আমি ভিখিরি। আমার এগারো নম্বরেই আস্থা রাখতে হয়। শ্রমজীবী মানুষের সাথে থাকব,না খেতে পাওয়া মানুষের ছবি বানাবো,আর গাড়ি চড়ে ফুটানি মারব,সে পাঠশালার ছাত্র আমি নই। 
: দাদা একটা কথা জিজ্ঞেস করব? 
: একটা কেন,হাজারটা করবে। 
: আপনাকে না’কি ক্যাবিনেটে জ্যোতি বাবু চান? 
: পাগল হলে! আমার মত পাগল ক্ষ্যাপাটে নেশারুকে জ্যোতি বাবু মন্ত্রী বানাবেন? হাসালে। ওর শালাবাবু আমার বিশেষ বন্ধু,তাই এসেছিল দেখা করতে। হ্যাঁ,বলেও ছিল ‘ভুল বোঝাবুঝি তো অনেক হল,এবার দলে ফিরুন। এখন পার্টি ক্ষমতায় আসছে,খুশির দিন’। আমি তাড়িয়ে দিয়েছি দূর দূর করে। আমি শালা ঋত্বিক। কম্প্রোমাইজ আমার ধাতে নেই। বাপ ছিল ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। আমি কাঠ বাঙাল সে কথা জানো। ঢাকার জিন্দাবাজারে আমার জন্ম। ন ভাই বোনের আমি ছোট। তেল মারিওনি কাউকে,মারতে পারবোও না। দাদা,মনীষের সাথেই কি ঝামেলা হয়ে গেল সেদিন। ওদের বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়ির মুখও দেখিনা। বুড়ি মানে মহাশ্বেতা বলছিল,বাবার সাথে অমন কর না ভবা। বাবা নরম মনের মানুষ,দুঃখ পাবে। আমি তো ভিখিরিই। ভিখিরি কি রাজা হবে না’কি! তার আবার কম্প্রোমাইজ এর দরকার কি? 
লেকের ধারে এখন ওরা। এ জায়গাটা সুন্দর। গাছে গাছে ঘেরা পাখি ডাকছে। জলে পাতার মধ্যে দিয়ে রোদ এসে পড়েছে। এক অদ্ভুত লুকোচুরি। অনেকক্ষণ চুপ সবাই। ঋত্বিক গলায় ঢেলে দিচ্ছে অমৃত। মাথার মধ্যে কেমন যেন সব শূন্য। পাখি ঢোকা বেরুনোর অনেকটা অবসর। সেই পুরনো ভবাকে তার মনে পড়ছে। বাবা সুরেশচন্দ্রর সাথে রাজশাহী যাওয়া। নাটকের দল গড়া। অভিনয়। যমজ বোন প্রতীতির সাথে লুকোচুরি খেলা। একবার পুকুরে স্নান করতে গিয়ে কি অবস্থা! ডুবে যায় যায়! মা ইন্দুবালা কেঁদে আর কূল পায়না। ‘৪৩ এ এ দেশে আসা। কি জানি মনটা বড় উদাস হয়ে যায়। ভবাটা ঋত্বিকের ভেতরে আবার প্রকট হয়ে উঠছে ক’দিন হল। মন খারাপের আদতেই কোনো ডাকনাম হয় না। শিলং পাহাড়ের কথা মনে পড়ছে। সুরমার সাথে আলাপ। কলকাতার রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটা। মার্ক্সের একের পর এক ডায়ালেকটিকস আওড়ে যাচ্ছে আর সুরমা হাঁ করে তাকিয়ে মুখের দিকে। সে সময়ে আলো বুঝি অনেক বেশি ছিল। 
: দাদা শরীর খারাপ লাগছে? 
খেঁকিয়ে ওঠে ঋত্বিক। তোমরা সকলে মিলেতো আমায় ফের অসুস্থ করে দেবে,অসুখ আসলে কোথায় জানো? এই গোটা সমাজটায়,পোকা ধরেছে। থক থক করছে পোকা! এই যে কমিউনিস্টরা সরকার গড়ছে একটা ব্যুরোক্রাটিক সরকারে,কি করবে? কিছু কামাই ধান্দা আর চরিত্র স্খলন আর কিস্যু হবে না। কিস্যু করতে পারবে না। এ সমাজ এ দেশে ঘুণ ধরেছে পরতে পরতে। দাও মদ দাও,দাও। 
: দাদা আমি কি পেতে পারি আপনার প্রসাদ? 
: আলবাত পারো। কিন্তু আমারতো টিবি। আর প্রসাদ কি? আমি কি ঈশ্বর না’কি। আই হেট তোমাদের ঈশ্বরকে। আমি শয়তান। আয়াম ডেভিলস রিপ্রেজেন্টেটিভ এই বাংলায়! 
: কি বলছেন দাদা! আর টিবিতো আমাদের ন্যাশনাল ডিজিজ! হয় হোক। যে দেশে ঋত্বিক ঘটকের মত মানুষ এভাবে বাঁচে,সে দেশে আমরাই বা বেঁচে কি করব! 
: তবু বাঁচতে হয়,বন্ধু। তবু লড়তে হয়। আমারতো জীবন উপান্তে পৌঁছেছে। ওই আকাশটার মত। ওই যে লাল আকাশটা ফিকে হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছে,একটু পর মিশে যাবে কালো নিকষ অন্ধকারে। আমার মত…
দাদা আপনার কত কাজ ইনকমপ্লিট হয়ে পড়ে,সেগুলো শেষ করতে হবে তো। এখনই মরবেন কেন? কি বলেন,আমরা আছিতো। 
খানিক চুপ করে,তোমরা আছো সেটাই ভরসা। হ্যাঁ শেষ করব। শান্তিনিকেতন থেকেই শুরু করবো শুট। আবার নামতে হবে মাঠে। বড় কুঁড়ে হয়ে যাচ্ছি হে…
উঠে পড়েন লেকের ধার থেকে। হন হন করে হাঁটতে থাকেন সাদার্ণ এভিনিউ ধরে। মায়াবী হাল্কা আলোর মাঝে খোঁচা খোঁচা চুল,এক গাল দাড়ি,কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে হেঁটে চলেছেন, দ লাস্ট সামুরাই।

৯সেপ্টেম্বর,১৯৭৭

বোলপুর আসলেই পাগলামিতে পেয়ে বসে তাকে। এই শ্যামবাটির ক্যানাল পাড়ে বসে ময়ূরাক্ষীর উপছে পড়া জলের গর্জন শোনা। খোয়াইতে পৌঁছে আলো আঁধারির খেলায় প্রাকৃতিক ভাস্কর্যকেই ছুঁয়ে দেখা। অথবা বল্লভপুরের বিশালাকার গাছগুলোর মাঝে হারিয়ে যাওয়া। সুরুল গ্রামে বসে হাঁড়িয়া খাচ্ছিলন… সাথী নেশারু রাম কিংকর। ঋত্বিকের কিংকরদা। এখন হেঁটে ফিরছেন শ্রীনিকেতন রোড ধরে কালিসায়রের পাশ দিয়ে। কি খেয়াল হল কালীসায়রের পাশে গিয়ে বসে পড়েন। রাত অনেক। তারকা খচিত আকাশ। ঋত্বিক হঠাৎ গেয়ে উঠলো - আকাশ ভরা সূর্য তারা...কিংকর দা বলে উঠলো জর্জের গলায় এত ভালো লাগে এই গানটা,জর্জ অনেক দিন আসেনা। কথা বার্তাও হয় না। 
ব্যস যায় কই! ঋত্বিক শুরু করলেন। এই এক তোমাদের হয়েছে। কেবল জর্জ আর জর্জ। জর্জ বিশ্বাস ছাড়া যেন এই বাংলায় আর কেউ রবীন্দ্রসংগীত গায় না। 
: ঋত্বিক,জর্জের ওপর এখনও অভিমান! সেতো কবেকার কথা। জর্জ কি করবে! ও আমায় সব বলেছিল সে সময়। তোমার পার্টি ডিসিশন নিয়েছে,তুমি পার্টি লাইনের বাইরে চলেছ,তাই এক্সপেল করবে। জর্জের কি দোষ এখানে? সেতো তোমায় বুঝিয়েছিল। এত রাগ করলে হয়! 
হাসতে শুরু করেছে ঋত্বিক। চারদিক নিঝুম, ফলে হাসির প্রতিধ্বনি হচ্ছে। 
: কিংকরদা আমি ঋত্বিক ঘটক। জর্জ বিশ্বাস বল বা আমার স্বর্গত বাপ,আমায় কে বোঝাবে! কিন্তু রাগতো নেই। ভালোবাসি জর্জ বিশ্বাসকে। পার্টি লাইন মানতে গেছিল সেদিন। আজ কি অবস্থা,সেটা বল! ছাড়ো ওকথা,আমি এবার কেন এসেছি জানো? 
: হুঁ।
: কি কারণ বলতো,এই সব মদ্যপান এদিক ওদিক হচ্ছে আসল কাজটা আর হয় না। 
: জানি। তুমিই ভুলে গেছ,কেন এসেছো। আমার ডকুমেন্টারি শেষ করতে। 
: না ভুলিনি। তোমায় এত লোক সারাটাক্ষণ ঘিরে থাকলে কথা এগোয় কি করে? 
: আমায় ঘিরে থাকবে কেন? আমি কি ঋত্বিক ঘটক? শুটিং তো শেষ,বাকিটা কি,সেটাই তো জানিনা। 
: কিংকরদা পোস্ট শুট কত কাজ থাকে। কিন্তু আমার কিছু খুঁতখুতুনি। 
: সুজাতা নিয়ে কিছু বলনি।। বলনি গুরুদেবের তোমায় বকুনি দেওয়া নিয়ে,আরও কত কি খুঁটিনাটি…
: আচ্ছা বলব,কিন্তু প্রোডিউসার পেলে? 
: কিংকরদা ঋত্বিক ঘটকের প্রোডিউসারের অভাব? আর তোমায় নিয়ে ডকু,প্রোডিউসারের অভাব! হাসালে! 
: আজ নেশাটা জমেনি। ধুর! এত সহজ স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছি আবার কাজের কথা নিয়ে। এতো মদ্যপানের প্রতিই অন্যায়,কি বল হে। 
: তাহলে আনাও হাঁড়িয়া আবার বসা যাক। 
ওদিক থেকে আলো এগিয়ে আসে যে। কিসের আলো কিংকরদা? 
: ঋত্বিক ভুত নয় ভগবান ও। ওরা আমার ছাত্র। তোমায় আমায় না পেয়ে খুঁজতে বেরিয়েছে…
রাত তখন বারোটার কাঁটা পেরিয়েছে। প্রকৃতি উজাড় করে দিয়েছে সৌন্দর্য। ফিরতি পথে কিংকরদা বলতে থাকেন
: বাঁকুড়া যেতে ইচ্ছে করে একবার,পারিনা। এই প্রকৃতি,এই গুরুদেব ছেড়ে কোথায় যাবো ঋত্বিক! গুরুদেব প্রায়ই বলতেন,’প্রকৃত শিল্প হবে প্রকৃতির মত সহজ আর সুন্দর’ 
ঋত্বিক রেগে যান। চীৎকার করে ওঠেন। ভুল বলতেন। শিল্পকে ট্রুথফুল হতে হবে। মাটি ছুঁতে হবে তোমার শিল্পকে। মানুষের প্রয়োজনে লাগতে হবে। নইলে শিল্পের সফলতা কই? আমি বিশ্বাস করিনা মানুষের সাথে সম্পর্ক রহিত শিল্পে। ক – রি - না। তাই আইজেনস্টাইন আমার প্রিয়। কিন্তু সততা কই তোমার দেশে কিংকরদা। শঠতায় ভরে গেছে দেশ। এই মিডিওক্রিটি এই হিপোক্রিসি,নিজেরটা বাগিয়ে নাও তাহলেই একমপ্লিসমেন্ট। ধুর! দেখে দেখে চোখ পচে গেল। আর তাই বাঁচতেই ইচ্ছে করে না। ওই বাংলায় তিতাসের শুটিং স্পটেই তো মরছিলাম,হেলিকপ্টারে করে নিয়ে এসে বাঁচালো। কি লাভ হল ওদের কে জানে। প্রতিদিনের এই মরার থেকে একদিন মরাই ভালো। 
কিংকরদা চুপ করে শুনছিলেন। সাঁইথিয়া যাওনি কেন? সুরমার সাথে কথা বন্ধ? 
: লক্ষ্মী আমায় সহ্য করতে পারে না কিংকরদা। আর আমিওতো তেমন নই। কিছু দিতে থুতেও পারিনা। ছেলে মেয়েগুলো বড় হচ্ছে,টাকা পয়সাতো লাগেই। দেখি তবু যাবো একবার। 
জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে রতনপল্লী। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে দুই ক্ষীণকায় ছায়ামূর্তি গভীর আলোচনায় মগ্ন। কিছু পর ভোর হবে অন্য দিন। লাল মাটির পথে শিশির পড়ছে,দূর থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে এলো,চাঁদ সরছে পশ্চিম থেকে পূবে,ভোর হবে। হবে হয়ত! 
ঋত্বিক আর ভবার লড়াইটা আরও বেড়েই চলেছে। শান্তিনিকেতনে আসলেই এমন হয়। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মদ্যপান। ভবা আর ঋত্বিকে কথা হবার সময় আগে ছিল খুব ভোর,হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর। এখন ভর দুপুরেও ভবা এসে হাজির হয়। হাতে বাংলা মদ গলায় ঢালতে ঢালতেও ভবা এসে মেরে দেয় দুই ঢোঁক। ঋত্বিক কেড়ে নিতে চায় বোতল। কাড়াকাড়ি বোতল ভাঙা,রক্তারক্তি,সে এক বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার। গতকাল দুপুরে এসে হাজির তিন মূর্তি। সুনীল,শক্তি সন্দীপন। কি’যে হয়েছে চিনতেও পারেনি। আজকাল মরণ রোগে ধরেছে। অনেককেই চিনতে পারে না। বেমালুম ভুলে গেছিল ওদের। অথচ পূর্ণেন্দু পত্রী এর আগে তিনবার আলাপ করিয়েছে। ওরা বলছিলো এ কথা সে কথা। বলল,কবিতা শোনান। শোনানো হল। শক্তিটা একেবারে বেহেড। রবীন্দ্রসংগীতটা ভালো গায়,কবিতা বেশ ভালো লেখে কিন্তু পেটে মদ গেলেই কেলোর কীর্তি। কাল শক্তিকে তাড়িয়েই দিয়েছে ঋত্বিক। পরিস্কার বলেছে,দেখ বাবা কবিতা লেখ বলে মাথা কিনে নাওনি। দু পাত্তর চড়ালে যদি বাওয়াল কর,তো ফুটে যাও। আমার মাতলামি পছন্দ না একদম। আর সন্দীপন হল আঁতেল নাম্বার ওয়ান। হ্যানা ত্যানা উদ্ভট সব প্রশ্ন। শক্তিকে বলায় তেনার আবার রাগ হল,দুম করে বলে বসল,আপনি কি নিজেকে বড় ডাইরেক্টর মনে করেন? আটটা ছবি বানিয়ে এত ডায়ালগ! আর আটাশটা ইনকমপ্লিট! 
ঋত্বিকের মনটা সেই তখন থেকে খারাপ। তা বলে হার মানেনি। বলেছে দেখ দেখ,এই আটটা ছবির জন্যই বাঙালী আমায় মনে রাখবে। আর তুমি এত ফটর ফটর কর কেন? তুমি ফিল্মের কি বোঝ? 
: না,বোঝেন কেবল আপনি। ওই জন্য সত্যজিৎ বলেছে সেদিন,আপনি যদি একটু ডিসিপ্লিনড হতেন। অযান্ত্রিক যদি সময়ে রিলিজ করত,আপনি পাথ ফাইন্ডার হতেন।’ 
: ও সত্যজিৎ বলল,আর হয়ে গেল? আমি বাপু গান্ধী নেহরু বা সত্যজিতের মত অত ব্যালান্স করা লোক না। আমার ইচ্ছে মতন বাঁচি। 
: সেই। মেলোড্রামা ছাড়া আর কিছু বোঝেন? 
: রুটলেস মানুষের কান্না যদি মেলোড্রামা হয় আমি তাই দেখাবো।

সৌজন্যে: লিটস্ক্যান-১১, আলমগীর হক স্বপন