
বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া টানা তিন দিন ধরে রাজধানীর বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তার শারীরিক অবস্থা বলার মতো উন্নতি হয়নি; নতুন করে অবনতিও হয়নি। চিকিৎসক ও বিএনপি নেতারা বলছেন, বিদেশে নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা এখন খালেদা জিয়ার নেই। তবে শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে। এ অবস্থায় স্থিতিশীল থাকাটা চিকিৎসকদের ভাষায় ইতিবাচক। কিছুটা উন্নতি হলেই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবস্থা বুঝে সিঙ্গাপুর কিংবা লন্ডন নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে পরিবারের।
এদিকে, খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনায় সাধারণ মানুষসহ বিএনপি নেতাকর্মীরা দোয়া মাহফিল করছেন। উদ্বিগ্ন নেতাকর্মীরা হাসপাতালের সামনে ভিড় জমাচ্ছেন। যদিও দল থেকে হাসপাতালে ভিড় করতে বারণ করা হয়েছে।
৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন থেকে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার সিরোসিস, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। গত রোববার রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বুকে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ডের নিবিড় তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ইনফেকশনের শঙ্কায় তাকে সিসিইউতে নেওয়া হয়।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য গতকাল সন্ধ্যায় জানান, খালেদা জিয়ার নতুন করে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়নি। এটাই চিকিৎসকদের কাছে ইতিবাচক। নিউমোনিয়া হওয়ায় প্রথম দিকে তাকে কিছু অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল। সিঙ্গাপুর নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কন্ডিশন ট্রাভেল করার মতো হলে সিদ্ধান্ত হবে। সিসিইউতে এক্সট্রা কেয়ারে রাখা হয়েছে। শনিবার সিসিইউ থেকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত ফলোআপ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, তিনি মেডিকেল বোর্ডের দেওয়া চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন। গতকাল রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে গণমাধ্যমকে খালেদা জিয়ার সর্বশেষ অবস্থা জানাতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, গত তিন দিন অর্থাৎ ২৭, ২৮ ও ২৯ তারিখ উনার অবস্থা একই পর্যায়ে আছে। এটাকে আমরা ডাক্তারি ভাষায় বলি, ‘শি ইজ ম্যানটেইনিং দ্য ট্রিটমেন্ট’, অর্থাৎ চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন এই চিকিৎসা উনি গ্রহণ করতে পারছেন। কাজেই এই চিকিৎসা যাতে উনি গ্রহণ করে সুস্থ হয়ে যেতে পারেন, সেই জন্য আপনারা সবাই দোয়া করবেন, এটাই আমাদের আহ্বান। বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক জাহিদ বলেন, বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে সার্বিকভাবে উনার শারীরিক সুস্থতা এবং মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও সুপারিশের ওপর। সেই সিদ্ধান্ত এবং সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
তিনি জানান, ইউকে, কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিংস এবং মাউন্ট সিনাইসহ বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকদের যৌথ আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই ম্যাডামের চিকিৎসা এখানে অব্যাহত আছে এবং চিকিৎসা অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার শারীরিক পরিস্থিতি বিদেশ নেওয়ার অবস্থায় নেই বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, শারীরিক অবস্থা আল্লাহর অশেষ রহমতে যদি স্টেবল (স্থিতিশীল) হয়, তখন চিন্তা করে দেখা হবে যে তাকে বিদেশে নেওয়া সম্ভব হবে কি না। গতকাল বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল এ কথা বলেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আমেরিকার জনস হপকিনস হাসপাতালের চিকিৎসক এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। গতকাল (শুক্রবার) রাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করে মেডিকেল বোর্ড জানায়, খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন। শারীরিক সামর্থ্যের কারণে বিদেশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত না হলেও প্রস্তুতির কথা জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, তবে বিদেশে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা, যেসব দেশে নেওয়া হতে পারে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কাজ এগিয়ে রাখা হয়েছে। যেন প্রয়োজন হলেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে বিএনপির নেতাকর্মীদের ভিড় না করার অনুরোধও জানান দলটির মহাসচিব।
এর আগে গতকাল দুপুরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনও খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেওয়ার জন্য সব বন্দোবস্তের কথা তুলে ধরেন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লেখেন, ‘আমরা যতটুকু শুনেছি, দেশবাসীর দোয়া ও ভালোবাসায় সিক্ত আপসহীন নেত্রীর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাকে লন্ডনে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরিকল্পনা করছে জিয়া পরিবার। এ বছরই লন্ডনের যে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের অধীনে চার মাস থেকে তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, তাদের সঙ্গে এরই মধ্যে যোগাযোগ করেছেন তারেক রহমান ও তার স্ত্রী। সেই লক্ষ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।’
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা স্থিতিশীল হলে চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর। গতকাল বিকেলে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান তিনি। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ‘আগের থেকে একটু ভালো’ জানিয়ে ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ‘উনি (খালেদা জিয়া) স্ট্যাবল (শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল) হলে অবশ্যই (বিদেশে) নেওয়ার একটা ব্যবস্থা করা হবে। নেওয়ার মতো অবস্থা এখনো হয়নি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত ড. এনামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অনেকটা স্থিতিশীল, যদিও এটি ওঠা-নামা করছে। চিকিৎসকরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন তাকে যথযাথ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। তবে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার ওপর।’
দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুস্থতা কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এদিকে, খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনায় উপদেষ্টা পরিষদের সভায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল দোয়া মাহফিল করেছে। গতকাল বাদ আসর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানের সভাপতিত্বে দোয়া মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুন আহমেদ, সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুস সালাম ও অধ্যাপক আবুল কালাম সরকার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান প্রমুখ।
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় বিশেষ দোয়া মাহফিল করেছে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি। গতকাল বাদ আসর রাজধানীর মতিঝিলে দলের চেয়ারম্যানের অস্থায়ী কার্যালয়ে এ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, সমমনা জোটের গোলাম মওলা চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আল হারুন সোহেল, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, এসএম শাহাদাত, খোকন চন্দ্র দাস, মো. মাহবুব আলম, মো. ফরিদ উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় বিশেষ দোয়া মাহফিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও। সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রদলের সাবেক নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলাম তারিকের উদ্যোগে গতকাল রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানায় গোর-ই-শহীদ জামে মসজিদে এ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় মসজিদে কোরআন খতম ও মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেন সাধারণ মানুষ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এদিকে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার বিষয়ে অবহিত হন।
হাসপাতালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা: বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। গতকাল সকাল ৭টার দিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক হাসপাতালে গিয়ে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন। সকাল পৌনে ৯টার দিকে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব কয়েকজন নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তাকে দেখতে যান। পরবর্তী সময়ে সকাল ১০টার দিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা ও মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার এবং আমজনতার দলের সদস্য সচিব তারেক রহমানও খালেদা জিয়াকে দেখতে যান। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও চেয়ারপারসনকে দেখতে গেছেন। দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন এবং যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্নাও হাসপাতালে যান।
মন্তব্য করুন