
বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ—এ কথা আমরা অনেকেই জানি, কিন্তু জানলেই কি প্রস্তুতি আসে? বাস্তবতা হলো, ভূকম্পন এখন আর দূরের কোনো বিপর্যয় নয়; বরং আমাদের নগরজীবনের প্রতিদিনকার অনিশ্চয়তার একটি স্থায়ী ছায়া হয়ে উঠছে। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ভূমিকম্পের মাত্রা ও ঘনত্ব, বৈশ্বিক টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়া ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, আর ঠিক সেই মানচিত্রের মধ্যেই বাংলাদেশ অবস্থান করছে তিনটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর। তাই প্রতিটি কম্পন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অপ্রস্তুত শহর, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং অসচেতন জনজীবন বিপদকে আরও বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সম্প্রতি দেশে কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে ঘুম ভাঙার পর অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেউ বলেছেন, ‘এ যেন বড় কিছুর পূর্বাভাস’, আবার কেউ জানিয়েছেন, কয়েক মুহূর্তের আতঙ্কই বুঝিয়ে দিয়েছে আমাদের অস্থির অবস্থা। অথচ ভূমিকম্পের এমন ঝুঁকি নিয়ে বহু বছর ধরেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট—দেশের প্রধান নগরগুলোই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের ওপর দাঁড়িয়ে, আর দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা ও উচ্চ ভবনের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির একটি বড় কারণ হলো আমাদের নির্মাণব্যবস্থার দুর্বলতা। বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলেন—“ভূমিকম্প মানুষকে মারে না, নির্মাণধস মানুষকে মারে।” সত্যিই তাই। পরিকল্পনা ও নীতিমালায় যেসব নিরাপত্তার নিয়ম রয়েছে, তার অনেকগুলোরই বাস্তব প্রয়োগ হয় না। অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও বহুতল ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং ভূমিকম্প সহনীয় নকশা অনুসরণ না করার প্রবণতা বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। ঢাকা মহানগরীর অনেক ভবনই রেট্রোফিটিংয়ের আওতায় নেই, যেগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধী করতে বিশেষ প্রকৌশল কাজে প্রয়োজন হয়। এসব ভবন বড় ধরনের ভূকম্পনে সহজেই ধসে পড়ে বহু প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
এদিকে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও রয়েছে অন্য ধরণের ঝুঁকি। সেখানে অধিকাংশ ঘরবাড়িই ইট-সিমেন্ট ছাড়া নির্মিত, যার ফলে সামান্য কম্পনে ফাটল দেখা দিতে পারে, আর শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ধসে পড়ার সম্ভাবনা আরও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তুলছে। অধিকাংশ মানুষ জানেন না ভূমিকম্পের সময় কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়। স্কুল, অফিস বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ড্রিল বা মহড়া হয় না; ফলে বিপর্যয়ের মুহূর্তে আতঙ্কই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু।
কিন্তু সবকিছুর মাঝেও আশার আলো রয়েছে। প্রযুক্তি, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং বিচক্ষণ নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিদেশের অনেক দেশে ভূমিকম্প পূর্বাভাস ব্যবস্থা, আরলি ওয়ার্নিং অ্যালার্ট, স্মার্ট বিল্ডিং প্রযুক্তি এবং জনসচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম রাখা যায়। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সংখ্যা বাড়ছে, গবেষণা এগোচ্ছে, নতুন বিল্ডিং কোড চালু হয়েছে, কিন্তু চ্যালেঞ্জ হলো এসবের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকাজই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় সংকট। সরু অলিগলি, যানজট, অগণিত অচিহ্নিত ভবন—সব মিলিয়ে উদ্ধারকারীদের কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই শহর পরিকল্পনায় জরুরি প্রবেশপথ, খোলা মাঠ, এবং নিরাপদ জোনগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন জরুরি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল, উন্নত উদ্ধার সরঞ্জাম এবং সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা থাকলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা সম্ভব।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমরা কী করতে পারি? প্রথমত, নিজের বাড়ি বা অফিস সম্পর্কে জানতে হবে—এটি ভূমিকম্প সহনীয় কি না। প্রয়োজন হলে প্রকৌশলীর পরামর্শ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, জরুরি কিট বা ‘ইমার্জেন্সি ব্যাগ’ তৈরি রাখা জরুরি—যেখানে থাকবে পানি, শুকনো খাবার, টর্চলাইট, পাওয়ারব্যাংক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের কপি ইত্যাদি। তৃতীয়ত, নিয়মিত পরিবারসহ মহড়া করা দরকার—কম্পন হলে কোথায় দাঁড়াবেন, কীভাবে সরে যাবেন, কীভাবে যোগাযোগ করবেন অর্থাৎ একটি ‘ফ্যামিলি সেফটি প্ল্যান’ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা। ভূমিকম্পের সময় আতঙ্ক নয়—সংযমই পারে জীবন রক্ষা করতে। ‘ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড’—এই সহজ কৌশলটি সবাইকে জানা উচিত। অর্থাৎ মাটিতে নিচু হয়ে বসতে হবে, মাথা ঢেকে রাখতে হবে এবং শক্ত কিছু ধরে রাখতে হবে যাতে ভারসাম্য হারানো না যায়। লিফট ব্যবহার করা যাবে না, দৌড়াদৌড়ি করা যাবে না, জানালা বা দেয়ালের পাশে দাঁড়ানো যাবে না। বাইরে থাকলে খোলা জায়গায় চলে যেতে হবে, আর ভবনের ছাদে থাকলে নিচে নামার চেষ্টা না করে সেখানেই নিরাপদ অবস্থান নিতে হবে।
ভূমিকম্পকে আমরা থামাতে পারব না, কিন্তু প্রস্তুতিকে শক্তিশালী করে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারব। দেশের প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের প্রতিটি বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে—কারণ ভূমিকম্পের আগাম জানিয়ে আসে না, কিন্তু তার ক্ষতি মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে বয়ে বেড়াতে হয়।
আমাদের সামনে আছে দুটি পথ। এক, আমরা চাইলে সচেতনতা, পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক সমাধানের মাধ্যমে ভূমিকম্পকে সামাল দিতে পারি। দুই, অবহেলা করলে আমাদের শহর, ঘরবাড়ি, মানুষ সবকিছুই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। সিদ্ধান্ত আমাদেরই হাতে—বাঁচার প্রস্তুতি নেব, নাকি বিপদের অপেক্ষায় থাকব?
বাংলাদেশ এখন পরিবর্তনের সময় পার করছে। তাই এখনই সময় নিজেদের প্রস্তুত করার, যাতে পরবর্তী কম্পন শুধু কিছু সেকেন্ডের দুলুনি হয়ে থাকে—দুর্যোগ না হয়ে ওঠে কোনো জাতীয় ট্র্যাজেডি।
লেখক, মো: শহিদুল্লাহ শিল্পী ও সাংবাদিক।
মন্তব্য করুন